১০১ তম - শাহেদুল ইসলাম মাহিম (পর্ব ১)


১০১ তম বারের মতো লাশ চুরি করতে যাচ্ছে ফাহাদ। ভয়ে আগের মতো এখন আর হাত পা কাঁপেনা তার। তবে কি সে অভ্যস্ত তাতে?
নাকি পেটের দায়ে এসব করতে হচ্ছে!
ছোট বেলায় তার মা বাবা দারিদ্র্যের কারণে তাকে রেল স্টেশনে ছেড়ে যায়। বয়স তখন ৮।
তাকে ভুতের ভয় কাবু করতে পারে না। কারণ তাকে তো কখনো কেউ ভূতের ভয় দেখাইনি। তাই বলে কি তার ভয় নেই? হ্যাঁ খুব ভয় তার, কিন্তু ভূতের নয় মানুষের।
আজ থেকে ১১ বছর আগে যখন তার ৯ বছর তখন থেকেই সে দেখেছে মানুষের ভেতরের অংগপ্রত্যঙ্গ।
মা বাবা ফেলে যাওয়ার ঠিক এক বছর আগে মাসুদ ভাই ফাহাদকে খুব নিখুঁতভাবে চুরি করতে দেখে।
সেই রাতে ফাহাদকে সেখান থেকে তুলে নেয় মাসুদ ভাই।
ছোট খাটো চুরি করে আর কতো আর কামাবি? তুই এসবের জন্যে না।
তোর কাজের দক্ষতা আমাদের বড় কিছু দিতে পারে।
ফাহাদও রাজি হয়ে যায়।
এই মাঝের বছর গুলোতে ফাহাদ হয়ে উঠে মাসুদ ভাইয়ের খুব প্রিয়।
দলের সবার কাছেও সে সুনাম অর্জন করে নিয়েছে।
তবে ১৮ বছর বয়সে দেখা দিয়েছে নতুন এক সমস্যা।
মাসুদ ভাই এর থেকে বড় কিছু করতে চায়।
খবর পেয়েছে কিডনি, চোখ এসব বাইরে সাপ্লাই দিতে পারলে রাতারাতি লাখ লাখ টাকার মালিক হওয়া যায়।
প্রথম প্রথম ফাহাদ নিষেধ করলেও পরে মাসুদ ভাইয়ের জোরাজোরিতে আর না করতে পারে নি।
মাসুদ ভাইয়ের বেশ ভালো কিছু দিক যদি বলতে হয়, তাহলে সেগুলো তার স্বার্থ হাসিলের জন্যেই ভালো সাজা।
না হলে তার কর্মকান্ড শয়তানকেও হার মানায়।
এখন কাজটা হলো এমন, লাশটা লাশ ঘর থেকে বের করে তাদের গাড়ির মধ্যে নিয়ে কিডনি, চোখ, লিভার এসব বের করা।
আর ফাহাদ বেশ কয়েকমাস লাশ ঘরের নার্স ও গার্ড হিসেবে চাকরি করে।
তাই কাটাকুটির বিষয়ে কিছুটা হলেও বাকিদের থেকে অভিজ্ঞ সে।
আজ ১০১ তম লাশ সে বের করতে যাচ্ছে আর মনে মনে আগের সব ভেবে বলছে এসব ছেড়ে সে দূর কথাও চলে যাবে।
কারণ সে বুঝতে পেরেছে মাসুদ ভাই ইচ্ছে করেই তাকে এখানে চাকরি করিয়েছে।
যাতে তার অভিজ্ঞতা হয়। কিন্তু তার সাথেই কেনো সব সময় এমন হয়?
সব জঘন্য কাজ গুলোই কেনো তাকে দিয়ে করানো হয়?
আর কেনোই বা সে এসব করে দু মুঠো ভাত খাওয়ার জন্যে?
নাকি প্রাণের ভয়ে!
ভালোবাসা নামক একটা শব্দ আছে তাতে সে পরিচিত নয়। উষ্কখুষ্ক চুল এক গাল দাঁড়ি আর তেলত্যালে রুষ্ক মুখের ভেতরে যে তার কতটা সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার ভেতর কখনো সে তা পরখ করেও দেখেনি। দেখতেও চায়-নি সে।
...........
এই ব্যবসাতে অধিক লাভ হলো সদ্য মৃত লাশ। অর্থাৎ কয়েক ঘন্টার মধ্যে লাশের এসব সংরক্ষণ করতে পারলে দ্বি গুন টাকা।
যেনো বাজারের তাজা মুরগী এনে রান্না করে খাওয়া।
এসব কিছুই কেমন জানি মনে হয় ফাহাদের।
কেমন? তা ফাহাদ নিজেও জানেনা।
তবে হ্যাঁ এটাই তার শেষ কাজ মাসুদে ভাইয়ের জন্যে।
লাশ গুলোর চেহারা কখনো ফাহাদ ভালো করে দেখেনি।
পেট কাটার সময় সে ভেবে নেয় কোন এক পুতুলের পেট কাটছে।
সব থেকে ভয়াবহ কাজ হলো যখন চোখ দুটি শরীর থেকে আলাদা করা হয়

প্রতিবারই তার মনে হয় চোখ দুটি তার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চায়!
ফাহাদের যেনো কান্না চলে আসে।
ছেলে হোক বা মেয়ে ফাহাদ কখনো শরীরের দিকে মনোযোগ দেয়নি।
দলের বাকিরা এতো নিকৃষ্ট ছিলো যে মেয়েদের মৃত লাশ গুলো দেখলে তাদের মনে বাসনা জাগে।
...........
লাশ ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ এক রুদ্ধশ্বাস, এটাই মাসুদ ভাইয়ের জন্যে শেষ কাজ হবে তার এরপর দূরে কোথাও পালিয়ে বাঁচতে পারবে কি সেই চিন্তা।
ভেতর থেকে খবর এসেছিলো একটি মেয়ে এক্সিডেন্ট করেছে এখনো পর্যন্ত লাশ কেউ নিতে আসে নি!
পোস্টমর্টেম হয়নি কারণ সেটা মাসুদ ভাইয়ের শিকার।
ফাহাদ লাশ ঘরে ঢুকে ১০১ নম্বর ড্রয়ার খুলে।
কি আশ্চর্য আজ তার ১০১ তম কাজ আর ড্রয়ারের নম্বরও ১০১।
লাশটি কোলে করে নিয়ে স্ট্রেচারে রাখতে গিয়ে ফাহাদের মনে কি যেনো আঘাত আনলো।
আজ প্রথম বারের মতো তার খুব ইচ্ছে করছে সাদা কাপড়টি একটিবার উল্টিয়ে দেখতে।
কয়েকমিনিট অতিক্রম হওয়ার পর তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ছিলো, সে দেখতে চায়।
মুখের উপর থেকে সাদা কাপড়টা আস্তে আস্তে যখন সরিয়ে নিচ্ছিল,
প্রথমেই ঘন কালো চুল কপালে বেন্ডেজের নিচে ভ্রু গুলোও এতোটা সুন্দর হতে পারে তা জানা ছিলো না ফাহাদের।
চোখ দুটো বন্ধ হলেও তার মনে হচ্ছে এর মাঝে নিশ্চয়ই প্রাণ আছে।
নাক সরু একটু লম্বা।
গোলাপি ঠোঁট মেয়েটির।
সব মিলিয়ে মনেহচ্ছে, এ যেনো একটি পুতুল।
তার মনে হয়েছিলো সত্যিই কোন পুতুলকে সাদা কাপড়ে মোড়ানো হয়েছে।
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে মনেহচ্ছে, ফাহাদ দিনের পর দিন পার করে দিতে পারবে।
বাইরে থেকে শাকিলের ফোন-
কি রে ভাই লাশ আনতে গিয়ে নিজেই লাশ হয়ে গেলা নাকি?
- না রে লাশটা এখনো আসেনি, আমি খুঁজছি।
- আসে নি মানে? শ টাক্কা খবর আছে হ্যাঁ আজকে একটা মেয়ের লাশ এসেছে এখানে৷ আর আজকের সাপ্লাইটা কতো ইম্পরট্যান্ট তাও তো জানো না কি?
আচ্ছা দাঁড়াও আমি ভেতরে আসার ব্যবস্থা করছি।
- না নাহ!
.
ফোনের লাইন কেটে গেলো।
ফাহাদের শরীর বেয়ে ঘাম ঝড়তে লাগলো।
আজ সে প্রথম বারের মতো মিথ্যে বলেছে।
কেন বলেছে সে তা ভাবছে না।
ভাবছে যদি শাকিল আসে আর তাকে দেখে ফেলে? কিছু একটা করা দরকার!
ফাহাদ তাড়াতাড়ি মেয়েটির লাশ, পোস্টমর্টেম করানো হয়েছে এমন লাশ গুলোর মাঝের একটি বক্সে ঢুকিয়ে দেয়।
শাকিল এসে সবটা খুঁজেও পায় না!
শাকিল বললো-
আচ্ছা ঐ ড্রয়ার গুলোতে দেখি?
- ওগুলোতে তো খালি লাশ ভেতরে কিছু নেয়।
- ভেতরে কিছু নেয় মানে?
- আরেহ পোস্টমর্টেম করা লাশ গুলো ওগুলোতে রাখা হয়।
- হ্যাঁ , তাও ঠিক। তবে মাসুদ ভাইকে কি বলবো?
- আপাতত আমাদের যে এই খবরটা দিয়েছে তাকে নিয়ে মাসুদ ভাইয়ের কাছে যাওয়া যাক। না হয় মাসুদ ভাই আমাদের আস্ত রাখবে না।
- চলো যাই তাহলে।
ফাহাদ দরজা বন্ধ করার সময় সেই ড্রয়ারের দিকে তাকালো।
কেনো করেছে ফাহাদ এমন?
এই প্রশ্নে আজ রাতে কি তার ঘুম হবে?
......
চলবে....

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)