বান্ধবী - সাজি আফরোজ (পর্ব ১)


বিকেল বেলা ঝড়ো বৃষ্টি বয়ে গিয়েছে এলাকার উপর দিয়ে। সন্ধ্যে এসে গেলো, বাতাসটা এখনো থামেনি!
এই বাতাসের মধ্যেই ঝুমুর বাসায় চলে আসলো মুনিয়া। যদিও খুব বেশি দুরত্ব নয় দুজনের বাড়ি।
ইউ আকৃতির দ্বিতল বাড়িটায় প্রবেশ করে গুটিগুটি পায়ে মুনিয়া এগিয়ে গেলো ঝুমুর রুমের দিকে। দরজা খোলা আছে। এতো বড় মেয়ে হয়েছে তবুও দরজা বন্ধ করে ঘুমোতে ভয় পায় ঝুমু। এদিকে জানালা গুলোও খোলা। বাতাসে পর্দা উড়ছে। খাটের উপরে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে ঝুমু।
তার অবস্থা দেখে মুচকি হাসলো মুনিয়া। ঠান্ডা লাগছে কিন্তু জানালা বন্ধ করেনি ঝুমু। আজব মেয়ে!
একটা চাদর নিয়ে ঝুমুর দিকে এগিয়ে যেতেই চমকে গেলো মুনিয়া। ঝুমু বসে আছে খাটের উপরে। তাকে দেখে ভ্রু জোড়া কুচকে মুনিয়া বললো-
তুই ঘুমোসনি?
-ঘুমোলে বুঝি ডাকতিস না?
-এটা আর নতুন কি! যেই মতলবে আসিনা কেনো, তোর ঘুম নষ্ট করতে ইচ্ছে করেনা।
-আজ কি মতলবে এসেছিস শুনি?
-আমার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে।
-বাসায় আইসক্রিমের ছিটেফোঁটাও নেই।
-এই আবহাওয়ায় হেঁটে হেঁটে খেতে ইচ্ছে করছে।
-এখন! অসম্ভব। কি বৃষ্টি টাই না হলো। এখন বাইরে কাদায় ভরে আছে নিশ্চয়।
.
মুনিয়া মুখটা গোমড়া করে বললো-
ঠিক আছে লাগবেনা। আমি নিজেই খেতে যাচ্ছি। তুই রুমে বসে বাতাসই খা।
.
মুনিয়াকে এগিয়ে যেতে দেখে ঝুমু তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো-
ওই? আমাকে ফেলে আইসক্রিম খাবি! চলবে না। আমিও যাবো।
.
মুনিয়া জানতো, ঝুমু কখনো তার কথা ফেলতেই পারেনা।
সেই ছোট বেলা থেকে বন্ধুত্ব তাদের। এক সাথে একই স্কুল, কলেজে পড়েছে। বর্তমানে অনার্স করছে একই সাথে। সবে মাত্র সেকেন্ড ইয়ারের ফাইনাল এক্সাম দিয়েছে তারা। দুজনকে দেখলে যেকেউই মনে করে আপন বোন।
.
বাড়ি থেকে বের হয়ে পাশাপাশি হেঁটে চলেছে ঝুমু আর মুনিয়া।
মুনিয়া মুচকি হেসে বললো-
আমার জন্য আন্টির কাছে মিথ্যে বলে বের হতে হলো তোকে।
-হু। এই সময় তোর বাসায় ছাড়া অন্য কোথাও যাবো শুনলে কি বের হবার পারমিশন দিতো? মোটেও না। অবশ্য তুই নিজেও তোর বাসায় মিথ্যে বলে এসেছিস।
-হ্যাঁ।
-এই অসময়ে এমন অদ্ভুত ইচ্ছে কি করে হয় তোর?
-তুই আছিস বলেই হয়রে সোনা।
-পাম্প দিস না। কোন দোকান থেকে খাবি বল?
-যেকোনো একটা থেকে হলেই হলো। তবে আইসক্রিম নিয়ে বড় মাঠে যাবো।
-আবার বড় মাঠে কেনো! এই খারাপ অবস্থায় ওখানে কাকও থাকবেনা।
-মুনিয়া আর ঝুমু থাকলেই হলো। আইসক্রিম খেতে খেতে বাতাসের ঝাপটাও উপভোগ করা যাবে। তোর না এমন আবহাওয়া প্রিয়?
-মন্দ বলিস নি।
.
আইসক্রিম নিয়ে মুনিয়া আর ঝুমু এগিয়ে আসলো বড় মাঠের দিকে। মাঠটা আকৃতিতে বিশাল বলে এলাকার সবার কাছে বড় মাঠ নামে পরিচিত।
এই মাঠে সবসময় মানুষের উপস্থিতি থাকে। বিশেষ করে ছেলেরা খেলার জন্য আসে। তবে আজ কাউকে দেখা যাচ্ছেনা। মেঘাচ্ছন্ন আকাশের নিচে বড় একটা খোলা মাঠ, দেখতে খুব ভালোই লাগছে ঝুমুর। মৃদু বাতাসও বইছে।
চুলের লাগানো কাটা সরিয়ে নিলো ঝুমু। এই বাতাসে খোলা চুলে হাঁটতেই যেনো ভালো বেশি লাগে।
মুনিয়া আইসক্রিম খেতে খেতে ঝুমুর কান্ড দেখতে লাগলো।
ঝুমু মুনিয়ার উদ্দেশ্যে বললো-
আমার আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছেনা। খাবার নষ্ট করা ঠিক না। নাহলে ফেলেই দিতাম। এখন এটা কি করবো!
-আমাকে দে।
-অসম্ভব।
-তুই একটা আইসক্রিম নিয়ে কিপটামি করছিস আমার সাথে?
-একসাথে দুটো আইসক্রিম খেলে তোর ঠান্ডা লাগতে পারে মুনিয়া। সো এটা আমি তোকে দিতে পারিনা।
.
-আমি কি নিতে পারি?
.
একটা ছেলের কন্ঠ শুনে চমকে গেলো দুজনেই। পেছনে ফিরতেই দেখতে পেলো, বেশ লম্বা একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। অন্ধকারে তার চেহারাটা তেমন একটা বোঝা যাচ্ছেনা বলে মুনিয়া বললো-
আপনি কে? এলাকার কেউ?
-নাহ। এই এলাকায় আমার মামা থাকেন৷ আমি ঢাকা থেকে এসেছি মামার বাসায়। ভাবলাম আশেপাশে একটু ঘোরাঘুরি করি। যাই হোক, আইসক্রিম টা আমাকে দেয়া যাবে কি?
.
ঝুমু তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো-
কেনো নয়!
.
একটা অপরিচিত ছেলেকে এক কথাতেই ঝুমু আইসক্রিম দিয়ে দিলো। বিষয়টা কেমন হটকা লাগলো মুনিয়ার কাছে।
.
ছেলেটি তাদের উদ্দেশ্যে বললো-
আপনাদের পরিচয়?
.
ঝুমু বললো-
আমি ঝুমু আর ও মুনিয়া।
-বোন বুঝি?
-জ্বী।
-দেখেই বোঝা যাচ্ছে। বাই দ্যা ওয়ে আমি ইমরুল।
.
মুনিয়া ভ্রু জোড়া কুচকে বললো-
সেটা কি জানতে চেয়েছি আমরা?
-তবুও বললাম। অন্যদের পরিচয় নিলে নিজেরটা দিতে হয়।
-যদি অন্যদের প্রয়োজন হয় তবেই। আমাদের প্রয়োজন আছে কিনা জানতে চায়তে পারতেন।
.
ঝুমু ফিসফিসিয়ে বললো-
এভাবে কেনো কথা বলছিস তুই?
.
মুনিয়াও ফিসফিস করেই জবাব দিলো-
কে না কে! কিভাবে...
.
আর কিছু বলার আগেই কাঁশতে লাগলো মুনিয়া।
ইমরুল বললো-
ঠান্ডার মাঝে আইসক্রিম খাবার ফল এটা। যেটা সহ্য হয়না সেটা কেনো করতে যান বলুন তো? এখন যদি অসুখে পড়েন?
.
ইমরুলের মুখে এমন অধিকার সুলভ কথা শুনে চমকালো মুনিয়া। ঝুমু মৃদু হাসলো।
মুনিয়া সেসব পাত্তা না দিয়ে বললো-
চল ঝুমু বাসায় যাওয়া যাক।
.
আচমকা বৃষ্টি শুরু হলো। হঠাৎ এমন বৃষ্টি পড়বে ভাবতে পারেনি তারা। ঝুমু ও মুনিয়া একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। বৃষ্টিতে ভিজলে বাসায় কি বলবে? বাসার কেউ তো জানেনা, তারা এই অসময়ে বাইরে ঘোরাঘুরি করছে।
ইমরুল নিজের ছাতাটা তাদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো-
আমার মনে হয়েছিলো বৃষ্টি পড়তে পারে। তাই ছাতা নিয়েই বের হয়েছিলাম। আপনারা এটা নিয়ে যেতে পারেন।
.
মুনিয়া মুখটা বাঁকিয়ে বললো-
কোনো দরকার নেই।
.
কথাটি বলে সে এগিয়ে গেলো রাস্তার দিকে।
ঝুমুর পথ আঁটকে ইমরুল বললো-
আমি ছেলে মানুষ। দৌড়ে চলে যেতে পারবো মামার বাসায়। আপনারা এটা নিন প্লিজ। পরে নাহয় দিয়ে দিয়েন।
-কিভাবে দিবো?
-যদি সমস্যা নাহয় তবে ফোন নাম্বার দিতে বা নিতে পারেন।
.
একটু ভেবে ঝুমু বললো-
নিন ফোন নাম্বার।
.
ওদিক থেকে মুনিয়া চেঁচিয়ে বললো-
কই ঝুমু আয়?
.
ঝুমু ফোন নাম্বারটা দিয়ে, ছাতাটা নিয়ে আসলো। মুনিয়া বললো-
আইসক্রিম দিয়েছিস বলে গিফট করলো নাকি ছাতাটা?
-হু। তোর বাসায় চল। যেহেতু আমার বাসার সবাই জানে, আমি তোর বাসায় যাবার জন্যই বের হয়েছি তাই এখন ওখানেই যেতে হবে।
.
মুনিয়া ঝুমুকে জড়িয়ে ধরে বললো-
তাহলে আজ রাতেও থাক প্লিজ।
-কিন্তু...
-প্লিজ প্লিজ!
-ওকে।
.
ঝুমুর ডান গালে চুমু খেয়ে মুনিয়া বললো-
আমার ভালো বান্ধবী।
.
রাতের খাবার খেয়ে দুজনে রুমে এসে শুয়ে পড়লো। হঠাৎ শব্দ করে উঠলো মুনিয়ার ফোনে। ফোন হাতে নিয়ে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো, অপরিচিত একটা নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে-
আইসক্রিমের জন্য ধন্যবাদ দেয়া হয়নি তখন। ধন্যবাদ।
(ইমরুল)
.
মেসেজটি পড়ে ঝুমুর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে মুনিয়া বললো-
তুই কি ওই ছেলেটিকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছিস?
.
ঝুমু দুষ্টু একটা হাসি দিয়ে বললো-
হু। ছাতা ফেরত দেয়ার জন্য নাম্বার তো লাগতোই। তাই তোর টা দিয়ে কাজ সেরেছি। কেনো রে? সে মেসেজ দিয়েছে বুঝি?
.
কোনো কথা না বলে মাথা নেড়ে সাই দিলো মুনিয়া। সাথে মেসেজের রিপ্লাই দিলো-
ধন্যবাদের কিছু নেই! আপনি না নিলে ওটা হয়তো ফেলেই দিতাম। খাবার নষ্ট করা আমি পছন্দ করিনা। তাই আপনাকেই ধন্যবাদ।
(ঝুমু)
.
ঝুমু বললো-
কি রিপ্লাই করলি রে?
-তোকে কেনো বলবো! আমাকে আস্ক করে কি তুই নাম্বার দিয়েছিলি?
.
ঝুমু মুখটা গোমড়া করে শুয়ে পড়লো।
এদিকে ঝুমু সেজে ইমরুলের সাথে চ্যাট করে চলেছে মুনিয়া।
ঝুমু আপনমনে বললো-
এই মেয়ে কি করছে কি জানি!
নাম্বার যখন দিয়েছিলাম, জানাইনি এটা মুনিয়ার। মুনিয়া সেটা বুঝতে পেরে নিশ্চয় ফাজলামো করছে ছেলেটির সাথে।
কালই দেখা হলে জানিয়ে দিতে হবে, চ্যাট করা মেয়েটি আমি নয়।
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)