ঘূর্ণিঝড় - সাজি আফরোজ
বাড়ির সবাই সাইক্লোন সেন্টারের দিকে এগিয়ে গিয়েছে। কিন্তু কামাল যায়নি। সে যে তার দাদার ভক্ত! এই বাড়ি ছেড়ে তার দাদা নড়বেন না। কিন্তু বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। টিনের চাল ভেদ করে বাড়ির ভেতরেও বৃষ্টি পড়ছে। চারদিকে পানিতে ভরে যাচ্ছে।
খুব শখ করে বাড়িটা বানিয়েছিলেন রশিদ আহম্মেদ। যতোই তুফান হোক, এই ঘর ছেড়ে তিনি যেতে পারেন না।
বাড়ির ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে নীরবে কেঁদে চলেছেন রশিদ আহম্মেদ।
তার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছে কামাল। বিদ্যুৎ চমকানো দেখে কিছুটা ঘাবড়ে গেলো কামাল। শরীর গঠন বড় হয়ে গেলেও বয়স তার বেশি নয়। সবেমাত্র ১০বছরে পা দিয়েছে সে। দাদার উদ্দেশ্যে কামাল বললো-
দাদাগো? এভাবে দাঁড়িয়ে থাকবেন?
-হ্যাঁ। যে বাড়িতে কেউ থাকেনা সেই বাড়ি খুব সহজেই ধ্বংস হয়ে যায়।
-আপনি দাঁড়িয়ে থাকলে বুঝি বাড়িটা ঠিক থাকবে?
-হয়তো।
.
পেছনে ফিরে নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে রশিদ আহম্মেদ বললেন-
কামাল তুইনা ভালো সাঁতার জানিস?
-হ্যাঁ।
-তবে চলে যা সাইক্লোন সেন্টার বা নিরাপদ কোনো জায়গায়।
-না আমি আপনাকে ছেড়ে কোথাও যেতে পারিনা দাদাজান।
-জেদ করিস না কামাল! চলে যা।
-আপনি যেখানে থাকবেন আমি সেখানেই থাকবো।
.
নাতির কথা শুনে বেশকিছুক্ষণ নীরবতা পালন করলেন রশিদ আহম্মেদ।
আচমকা নাতীর হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বললেন-
আজ তোর জন্যই বের হচ্ছি আমি প্রাণের প্রিয় বাড়িটা ছেড়ে।
.
তারা বের হতেই চোখের সামনেই ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেলো বাড়িটি। তা দেখে কামাল বিস্ময়ের চোখে তাকিয়ে বললো-
আসলেই তো! এতক্ষণ আপনি ছিলেন বলে বাড়ির কিছু হয়নি।
.
অসহায় দৃষ্টিতে ভাঙাচোরা বাড়িটির দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললেন রশিদ আহম্মেদ। সেদিক থেকে নজর ফিরিয়ে চারপাশ দেখে ঘাবড়ে গেলেন তিনি। কল্পনার বাইরেও পানি চারদিকে। তা দেখে ভীত কণ্ঠে তিনি বললেন-
এক্ষুনি নিরাপদ কোনো স্থানে যেতে হবে রে কামাল!
.
মৃদু হেসে কামাল বললো-
আপনি আছেন তো দাদাজান! আপনি সাথে থাকলে আমার কিছুই হবেনা।
.
যতোই সাঁতার জানুক কামাল, এই পানিতে সাঁতার কাটার ক্ষমতা তার নেই ভালো করেই জানেন রশিদ আহম্মেদ। তাই তিনি কামালকে নিজের কাধে চাপিয়ে বললেন-
শক্ত করে আমাকে ধরে রাখ কামাল। হাত ছাড়বিনা। আমি সাঁতার কেটে ঠিক সাইক্লোন সেন্টারে আমাদের পরিবারের কাছে চলে যাবো দেখিস।
-হ্যাঁ দাদাজান।
.
রশিদ আহম্মেদের বয়স প্রায় ৬৫। এই শরীরে আর কতোই বা শক্তি থাকে! কিছুদূর যেতেই হাঁপিয়ে উঠলেন রশিদ আহম্মেদ। নাতির উদ্দেশ্যে অসহায় কন্ঠে বললেন-
আজ যদি তোকে বাঁচাতে না পারি, ক্ষমা করে দিসরে কামাল।
.
দাদার কন্ঠস্বর শুনে কামাল বললো-
কষ্ট হচ্ছে তাইনা দাদাজান আপনার?
-নারে। হাত ছাড়িস না তুই।
.
কিছুসময় নীরব থেকে কামাল বললো-
আপনি আমাকে ক্ষমা করে দিয়েন দাদাজান। অনেক ভালোবাসি আপনাকে।
.
কথাটি বলেই কামাল ধীরেধীরে রশিদ আহম্মেদের কাঁধ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলো। তার দাদাজানের কষ্ট যে তার সহ্য হচ্ছেনা!
হ্যাঁ, সেই রাতে কামালকে হারিয়ে ফেললেন রশিদ আহম্মেদ। সে বেঁচে আছে কিনা মৃত তা এখনো কেউ জানেনা। তবে ভাগ্যক্রমে সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন রশিদ আহম্মেদ। যতোদিন বেঁচে ছিলেন তিনি, প্রিয় নাতিকে একটা মুহুর্তের জন্যও ভুলতে পারেননি।
.
বি:দ্র: উপরোক্ত ঘটনাটি কোনো গল্প নয়। সত্তি ঘটনা অবলম্বনে লেখা...।

Comments
Post a Comment