ফিরে পাওয়া সেই অতীত - সাজি আফরোজ (পার্ট ৩)


আজ তনয় এর বিয়ে।বর এর পোশাক পরতেই নিপার কথা মনে পড়ে তার।নিপার খুব শখ ছিলো,সবার আগে সে তনয়কে দেখবে বর সাজে যেভাবে হোক।নাহলে বাসর করতে দিবেনা।ভাবতেই তনয়ের হাসি পেলো।আজ যদি বউ সেজে নিপা তার জন্য অপেক্ষা করতো.....
আচ্ছা নিপা কি জানে আজ তার বিয়ে!
বারান্দা টা যেনো নিপার সাথী হয়ে গেলো।দিনের বেশিরভাগ সময় সে এখানে কাটায়।
নিপা জানে আজ তনয় এর বিয়ে।তাকে দেখতে কেমন লাগছে আজ!নাহ সে কেনো তনয় কে নিয়ে ভাববে!তনয় যে নতুন জীবন শুরু করতে চলেছে তাতেই সে খুশি।হুম অনেক খুশি।
হঠাৎ রাসেল এসে পেছন থেকে ডাক দেয় নিপাকে।নিপা যেতেই রাসেল তাকে কোলে উঠিয়ে ঘুরতে থাকে।
-আরে কি করছো তুমি?
-আজ খুশির দিন নিপা।
-হঠাৎ কি হলো যে এতো খুশি তুমি?
-আহা বলছিতো।
-ঠিক আছে,আগে নামাও আমাকে তারপর বলো কি হয়েছে।
(নামিয়ে....)
-মা বলেছে তোমাকে নিয়ে তার আর কোনো সমস্যা নেই।আমরা বাচ্চা দত্তক নিবো।একটা ছেলে আর একটা মেয়ে।তাতে মা রাজি হয়েছেন।
আজ নিপার খুশির সীমা নেই।তনয় এর জন্য ও সে খুশি আর রাসেল এর জন্যও।

তনয় নিজের রুমে গিয়ে দেখলো বউ সেজে বসে আছে ছোটখাটো একটা মেয়ে।আগে অবশ্য দেখতে গিয়েছিলো মেয়েটিকে।তবে সেইরকম খেয়াল করেনি।হুম মেয়েটা মোটামুটি সুন্দরী তবে চেহারাটা মায়াবী।কিভাবে মেয়েটির সাথে কথা শুরু করা যায়....
ভাবতে ভাবতেই পায়ে কিছুর ছোঁয়া পেলো।
-আরে কি করছো সালাম কেনো করছো?
-মা শিখিয়ে দিয়েছে।
-ও আচ্ছা।তোমার নামটা যেন কি?
-আশা।
মনে পড়লো তার হঠাৎ নিপার কথা।নিপা বলেছিলো বাসর রাতে সে তনয়কে সালাম করবেনা।সোজা এসে জড়িয়ে ধরবে।নাহ কি ভাবছে সে!নিজের বউকে সামনে রেখে অন্যের বউ এর কথা সে ভাবতে পারেনা।হুম নিপার জায়গা কেউ নিতে পারবেনা।তবে এই আশা এখন তার বউ।আর এই মেয়েরতো কোনো দোষ নেই।এই মেয়ের কোনো চাহিদা সে অপূরণ রাখবেনা।একজন স্ত্রী এর চাহিদা,অধিকার সবটা সে তাকে দিবে।
তনয় ও আশা কে নিয়ে নতুন জীবন এর পথে পা বাড়ালো আজ।
নিপার শাশুড়ি আগের মতো নিপার সাথে ভালো আচরণ করে।ঠিক আগের মতই নিপার খেয়াল রাখে,যত্ন করে।
রাসেল নিপার আগের চেয়ে বেশি খেয়াল রাখে এখন।চেষ্টা করে নিপাকে হাসি-খুশি রাখতে।রাসেল ঠিক করে তারা আরো কয়েকবছর পর বাচ্চা দত্তক নিবে।২-৩বছরের বাচ্চা দত্তক নিবে কেননা খুব ছোট শিশুর নিজের মায়ের কাছে থাকাটা জরুরী।
নিপা রাসেল এর সব কথাতে রাজি।সেও খুশি এমন একটা পরিবারের বউ হতে পেরে।
এদিকে এই আশা মেয়েটা তনয়কে অনেকটা বদলে দিয়েছে।আশা নিপার সব কথা জানে।তাই সে চায় নিপাকে ভূলে তার সাথে ভালো থাকুক তনয়।
তনয় ও চায় আশার সাথে ভালো থাকতে।তার ইচ্ছা ছিলো নিপা নূপুর পায়ে সারাবাড়ি মাতিয়ে রাখবে।তাই সে নিপার জন্য নূপুর বানিয়ে রেখেছিলো।সে নূপুর জোড়া আশাকে পরিয়ে দিয়েছে।না হোক নিপা,আশা মাতিয়ে রাখুক না বাড়িটাকে।
গল্পের শেষ এখানে হতে পারতো কিন্তু এটিতো আর গল্প নয়।
২বছর পর নিপা আর তনয় এর জীবনে এলো নতুন মোড়।
রাসেল প্রায় সময় বাহিরে থাকে।রাত করে বাসায় ফেরে।আগের মতো সময় দেয়না নিপাকে।
ওদিকে আশা তনয় থেকে ডিভোর্স চায়।আশা একজন কে ভালোবাসতো।বাসায় ছেলে পড়ালেখা করে বলে মেনে নেয়নি।এখন ছেলেটি ভিসা পেয়েছে।বিদেশ যাবে।আর সে আশাকে ফিরিয়ে নিতে চায়।আশা সবটা তনয়কে জানায়।
-দেখুন আমি চেয়েছিলাম সবটা ভূলে আপনি যেমন এগিয়েছেন আমিও আগাবো।এখন আর সম্ভব হচ্ছেনা।
-তুমি আমাকে লুকিয়েছো কেনো?আমাকে সবটা বললে আমি তখনি তোমাকে সাহায্য করতাম।
-সেও তখন নিরূপায় ছিলো তাই আমি বলার পরেও আমাকে নিয়ে পালাতে পারেনি।আমি জানতাম না সে ফিরে আসবে আবার।
এখন যদি নিপা ফিরে আসতো আপনি বুঝতে পারতেন।
বুকে লেগেছিলো কথাটা।সেও ভুক্তভোগী।হয়তো নিপার মত অসহায় ছিলো মেয়েটি।তাই আর না ভেবে ছেড়ে দিলো আশাকে।
খবরটা নিপা পায়।আচ্ছা তনয় এর ভাগ্যে কি ভালোবাসা নেই!ওর সাথে কেনো এমন হয়।
হঠাৎ নিপার ফোন বেজে উঠল।Unknown নাম্বার দেখে রিসিভ করলোনা।কিন্তু বারবার বেজে চলেছে দেখে রিসিভ করলো।
-হ্যালো
-কে বলছেন?
-আপু আমি তোমাদের পাড়ার ছোট বোন নয়ন।চিনতে পেরেছো?
-আরে না চেনার কি আছে!কেমন আছিস?তোর বিয়েতে যেতে পারিনি আমি।তবে শুনেছিলাম বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে তোর।শ্বশুড় বাড়ি ভালো লাগছে?
-হুম।আপু আমিতো ভালো ছিলাম তবে তোমার কথা ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেলো।
-কেনো?
-দুলাভাই....
-কি?
-মানে,আসলে..
-কি হয়েছে খুলে বলতো?
-দুলাভাই একটা মহিলা আর একটা বাচ্চা নিয়ে আমাদের এখানে ভাড়া থাকে।
-কি বলিস।তোর ভূল হচ্ছে।
-আমিও তাই ভেবেছিলাম।তবে উনি নিজে আমার হাসবেন্ড কে বলেছেন ওরা তার স্ত্রী আর বাচ্চা।
-দেখ তোর কোথাও ভূল হচ্ছে।
-না আপু এমন ই বলেছে।আমি সব ফ্লাট ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম,সবার সাথে পরিচিত হচ্ছিলাম।তখনি দুলাভাই কে ফ্লাট থেকে বের হতে দেখি।তখন গিয়ে ওই মহিলার সাথে কথা বলে জানতে পারি এসব।তাই তাড়াতাড়ি তোমার বাসায় ফোন করে তোমার নাম্বার নিয়ে তোমাকে জানালাম।তোমাকে আমার বাসার ঠিকানা টেক্সট করছি এসে খবর নাও আপু।
কিছু ভাবতে পারছেনা নিপা।হাত-পা অবশ হয়ে আসছে।রাসেল কি সত্যি....!না হয়তো নয়ন এর ভূল হচ্ছে কোথাও।তবে রাসেল এর অনেক পরিবর্তন হয়েছে তা ও অস্বীকার করা যায়না।হুম নিজে গিয়ে দেখে আসবে সে।
নয়নকে জানালো রাসেল ওখানে গেলে খবর দিতে।
খবর আসলো রাত ১০টাই।অফিস এর পর রাসেল ওখানে যায় তাই হয়তো বাসায় ফিরতে দেরী হয়।
এতো রাতে একা যাওয়া ঠিক হবেনা।ভাইকে ফোন দিলো সে।তার ভাই এখন পুলিশ অফিসার।ভাইকে নিয়ে ফ্লাট এ যায় নিপা।
হুম নয়ন যা বলেছে সত্য।প্রথমে স্বীকার না করলেও পরে নিপার ভাইয়ের ভয়ে সবটা স্বীকার করে রাসেল।
-নিপা বিশ্বাস করো সেদিন মা শর্ত দিয়েছিল হয় তোমাকে ছাড়ব না হয় নিজের বাচ্চা আনবো।আমিতো মায়ের একমাত্র ছেলে।
বিয়ে না করে কি করে সম্ভব এটা।এই মেয়েটা অসহায় ছিলো।টাকার বিনিময়ে রাজি হয়েছিলো বাচ্চা দিতে।বাচ্চা হয়ে গেলে তাকে টাকা দিয়ে ডিভোর্স দিয়ে দেওয়ার চুক্তি করি।কিন্তু আমি পারিনি নিপা মা এর কাছ থেকে তার সন্তানকে কেড়ে নিতে।এই মেয়েটাকেও কষ্ট দিতে।এই মেয়েটাও যে আমার বউ নিপা।
-বাহ রাসেল সাহেব বাহ।
আপনার আজ সব কষ্ট এই মেয়েটার জন্য হচ্ছে।আমি কিচ্ছুনা!আমিতো বলেছিলাম বিয়ে করুন।কষ্ট হলেও মেনে নিতাম।তবে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব না যে আপনি আমাকে এসব লুকিয়েছেন।আপনি এই মেয়েকে ঘরে তুলুন।ভালো থাকুন।আমার ত্যাগ আপনার চোখে পড়েনি।আমার কষ্ট ও না...
আর কিছু বলেনি নিপা।এক কাপড়েই চলে যায় সোজা বাবার বাড়ি।
কিছুদিন পরে পাঠিয়ে দেয় রাসেলকে ডিভোর্স পেপার।

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)