শেষ থেকে শুরু - সাজি আফরোজ (পর্ব ৭)
ড্রয়িং রুমটা বেলুন আর সাদা গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো।
টেবিলের উপরে লাভ শেইপের বিরাট একটা কেক। টেবিলের ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে সাব্বিরের পাশেই ফিরোজ। তাহলে এসবের সাথে কি সাব্বিরও জড়িত!
অগ্নি দৃষ্টিতে এলি তাকালো শাম্মির দিকে। মুখের হাসি বিলীন করে ফিসফিসিয়ে শাম্মি বললো-
তোমার হবু জামাই আছে মা।
.
রাগে কটমট করে এলিও ফিসফিসিয়ে বললো-
আমি ফিরোজকে বিয়ে করবোনা।
-উহু! ফিরোজ আঙ্কেল না। সাব্বিরের কথা বলছি। তার সামনে ঝামেলা করোনা।
-তা বললেই পারিস! হবু মেয়ের জামাই।
-হু।
.
-শুভ জন্মদিন আন্টি।
.
সাব্বিরের কথায় মুখে হাসি আনার চেষ্টা করতে থাকলো এলি।
শাম্মি হেসে বললো-
মা কে আমিই জোর করে লাল শাড়ি পরিয়েছি। ভালো লাগছেনা?
.
সাব্বির কিছু বলার আগেই ফিরোজ বলে উঠলো-
অপূর্ব!
.
আড়চোখে এলি তাকালো ফিরোজের দিকে।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে ফিরোজ একনজরে এলির দিকে চেয়ে রয়েছে। আগের মতোই সেই চাহনি!
মনেই হচ্ছেনা এতোটা সময় অতিবাহিত হয়ে গিয়েছে।
.
-কেকটা কাটা যাক?
.
শাম্মির কথায় ফিরোজের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিয়ে এলি বললো-
এসব কি হচ্ছে আমি কিছু বুঝছিনা শাম্মি?
-তোমার এতো কিছু বুঝতে হবেনা। আজ তোমার জন্মদিন তাই আজ কোনো প্রশ্ন না। আমরা যেমন বলবো তেমনটাই করতে হবে। এখন তুমি কেক কাটবে।
.
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর এলি বললো-
শাকিল কিন্তু বাসায় নেই।
-শাকিল আর আমি রাতে আরেকটা কেক কাটবো তোমার সাথে। প্রতিবার যেমন পালন করি আমরা ওইভাবে রাতেও করবো।
.
গম্ভীর গলায় এলি বললো-
এবারও তেমন করা যেতো।
-প্লিজ সোনা মা! এই রিকোয়েস্টটা রাখো। তোমার জন্য এতো কষ্ট করে আঙ্কেল এসব করেছেন.... প্লিজ?
.
-হুম আন্টি? না করবেন না আপনি।
.
সাব্বিরের কথায় মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো এলি।
এলির কাছে সাড়া পেয়ে শাম্মি খুশিতে বলে উঠলো-
কাছে আসো তোমরা? কেক কাটা যাক?
.
.
এলির মুখের দিকে হাত বাড়িয়ে কেক নিতেই সে ফিরোজের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো-
কেক কাটা পর্যন্ত ঠিক আছে। এর বেশি কিছু আশা করা ঠিক হবেনা।
.
এলির ডান গালে খানিকটা কেক লাগিয়ে দিয়ে ফিরোজ বললো-
এটা ঠিক আছে?
.
রাগে ফুসতে থাকলো এলি। তা দেখে তার নাকটা টিপে দিয়ে ফিসফিস করে ফিরোজ বললো-
আবার গরম হচ্ছো? এবার কিন্তু ফ্রিজ পাশেই আছে।
.
এলি কিছু বলার আগেই হাটু গেড়ে মেঝেতে বসে পড়লো ফিরোজ।
পকেট থেকে একটা রিং বের করে এলির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললো-
২০বছর আগে একবার তোমাকে হারিয়েছিলাম এলি। এবার এই সুযোগটা আমি আর হারাতে চাইনা। কি হয়েছে আমাদের বয়স বেড়ে গিয়েছে? মনতো আগেরটাই রয়েছে। মনের কি বয়স বাড়ে এলি? বাড়েনা তো। সব কিছু বাদ দিয়ে একবার আমাদের নিয়ে ভাবা যায়না এলি? বলো যায়না?
.
ফিরোজের দিকে তাকানোর সাহস হচ্ছেনা এলির। অন্য দিকে তাকিয়ে রয়েছে সে। চোখ জোড়া ছলছল করছে তার। ইচ্ছে করছে ফিরোজের ডাকে সাড়া দিতে কিন্তু সব কি এতোই সোজা?
.
-মা? এতো কি ভাবছো তুমি বলোতো? অনেকটাই তো করলে আমাদের জন্য। এবার নিজের জন্যও কিছু ভাবোনা মা? তোমার ভালোবাসার জন্যও ভাবো? ২০বছর আগে তার কি দোষ ছিলো বলতে পারো? তোমার জন্য এখনো তিনি বিয়েই করেননি। তার কি তোমাকে পাওয়া প্রাপ্য নয়? বলো তুমি?
.
এলিকে নিশ্চুপ দেখতে পেয়ে সাব্বির বললো-
সমাজ কি বলবে, কে কি বলবে সবটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন আন্টি। যেখানে আপনার আপন জনেরা সবটা মেনে নিয়েছে সেখানে বাইরের মানুষের কথা আপনি কেনো ভাববেন? আপনি শুধু আপনজন আর নিজেকে নিয়েই ভাবুন আন্টি।
.
শাম্মির আর সাব্বিরের কথা শুনে মুখে এক চিলতে হাসি ফুটলো এলির। আসলেইতো! কেনো সে অন্য কিছু ভাববে? যেখানে ফিরোজ, শাম্মি, সাব্বির তার পাশেই আছে! তার উপর দিয়ে যা বয়ে গিয়েছে অন্য কেউতো এসবের ভাগ নেয়নি। তবে কেনো তার ভালোবাসা কে দূরে ঠেলে দিবে সে? দিবেনা সে। এবার আর ফিরোজকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিবেনা।
চোখ দিয়ে বেয়ে পড়া পানিগুলো হাতের আঙুল দিয়ে মুছে নিয়ে হাসি মুখে ফিরোজের উদ্দেশ্যে এলি বললো-
আমি রাজি। তোমাকে বিয়ে করতে রাজি আমি ফিরোজ!
.
ফিরোজ কিছু বলার আগেই দরজার পাশে দাঁড়ানো শাকিল বলে উঠলো-
এসব কি হচ্ছে এখানে?
.
শাকিলকে দেখতে পেয়ে থমথমে হয়ে গেলো পুরো পরিবেশ।
বসা থেকে দাঁড়িয়ে পড়লো ফিরোজ। শাকিলের দিকে তাকিয়ে সে বললো-
আসলে শাকিল...
.
ফিরোজকে থামিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে আসতে শাকিল বললো-
মা তুমি বলবে এখানে কি হচ্ছে? আর কে এই লোকটা?
.
শাকিলের দিকে এগিয়ে গিয়ে শাম্মি বললো-
উনার সাথে মায়ের বিয়ে হবে।
-মায়ের বিয়ে হবে মানে?
-হু বিয়ে।
.
কাধের ব্যাগটা চেয়ারের উপরে রেখে শাম্মির উদ্দেশ্যে শাকিল বললো-
মশকারি করো আপু তুমি? এই বয়সে মায়ের বিয়ে? সিরিয়াসলি!
-আমি কোনো ফাইযলামো করছিনা শাকিল। যা শুনছিস একেবারেই ঠিক।
-আচ্ছা তাই! তা এতোদিন মা বিয়ে করলোনা। কি এমন হলো যে এই লোকটাকে মা বিয়ে করতে রাজি হলেন?
-উনি মায়ের প্রাক্তন প্রেমিক।
-ওয়াও! গ্রেট! প্রাক্তন প্রেমিকও ছিলো তাহলে মায়ের? তা তাকে এতোই বিয়ে করার শখ হলে তখন করলোনা কেনো বিয়েটা?
-শাকিল কথা সংযত করে বল।
-কিসের সংযত! এই বয়সে তারা এসব করতে পারবেন আর আমি কিছু বলতেও পারবোনা! একটা সমাজে থাকি আমরা আপু। আমি ছোট হয়ে যেটা বুঝছি তোমরা সেটা বুঝতে পারছোনা?
-শাকিল শুন....
.
শাম্মিকে থামিয়ে এলি বললো-
ওকে কিছু বলিস না শাম্মি। শাকিল ভুল কিছু বলেনি। আমার শাকিলের কথা ভাবা উচিত ছিলো।
-উচিত ছিলো বুঝতে পেরেছো তাহলে? এই লোকটা আসাতেই বদলে গেলে মা তুমি! আমাকে ছাড়া জন্মদিনের কেকটাও কেটে ফেললে৷ আবার লাল শাড়িও পরে আছো এই বয়সে। পুরনো প্রেমিককে পেয়ে বিয়ে করার আগেই এই অবস্থা তোমার! না জানি বিয়েটা হলে কতো কিছুই দেখতে হবে আরো!
.
শাকিলের কথা শুনে গলা গম্ভীর করে চেঁচিয়ে ফিরোজ বলে উঠলো-
নিজের মা সম্পর্কে এসব কি বলছো তুমি! মাথা ঠিক আছে তোমার? এতোটুকু ছেলে এমন কথাবার্তা শিখেছো কোথাথেকে?
-আমার আর ছেলের মাঝে তুমি কথা বলোনা ফিরোজ। তুমি আসতে পারো এখন।
.
এলির কথা শুনে ফিরোজ বললো-
তুমি ওর কথা পাত্তা দিওনা এলি। ও ছোট মানুষ।
-ফিরোজ তুমি যাও! এটা আসলেই হবার নয়। হবার হলে ২০বছর আগেই হয়ে যেতো।
-এলি?
-প্লিজ ফিরোজ! যাও তুমি।
.
এলির দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে সদর দরজার দিকে পা বাড়ালো ফিরোজ।
শাম্মিকে উদ্দেশ্য করে সাব্বির বললো-
তুমি এদিকটা সামলাও আমি আঙ্কেলের সাথে আছি।
-হু।
.
ফিরোজরা বেরিয়ে যেতেই রাগান্বিত কণ্ঠে শাম্মি বলে উঠলো-
হয়েছে শান্তি সবার? হয়েছেতো!
.
-শান্তি মানে? অশান্তি তোমরাই ডেকে এনেছো। বুড়া বয়সে এতো শখ আসে কোথাথেকে! ওই লোকের সাথে প্রেম থাকলে এই মহিলা আমার বাবাকে কেনো বিয়ে করেছে?
-আমার ধৈর্য্যের শেষ সীমানা পার করছিস তুই শাকিল!
-করলে করছি। কি করবা? যাই করো, ওই লোককে বাবা হিসেবে আমি মেনে নিবোনা। কখনই না।
.
কথাটি বলে হনহন করে হেটে নিজের রুমের দিকে চলে গেলো শাকিল।
.
শাম্মির দিকে একবার তাকিয়ে দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেললো এলি। নিশ্চুপভাবে এগিয়ে গেলো সে নিজের রুমের দিকে।
.
.
.
-শাশুমা কে যখন পটাতে পেরেছি শালা বাবাজিকেও পটাতে পারবো। আপনি কোনো চিন্তা কইরেন না ফ্রিজ সরি ফিরোজ আঙ্কেল।
.
সাব্বিরের কথা শুনে হালকা হাসলো ফিরোজ।
তার কপালে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে চিন্তার ভাজ।
সাব্বির আবারো বললো-
এলি আন্টিকে কতটুকু ভালোবাসেন আপনি?
.
কোনো দ্বিধা ছাড়াই ফিরোজ জবাব দিলো-
অনেক বেশিই।
-তাহলে ভরসা রাখুন নিজের ভালোবাসার উপর। সবটা ঠিক হয়ে যাবে।
-শাকিলের কথা অমান্য এলি করবেনা।
.
ফিরোজের কথা শুনে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললো সাব্বির। ভাবতে লাগলো কিভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা যায়!
.
.
.
ঘড়ির কাটা রাত ১২ টা ছুঁই ছুঁই। শহরের অধিকাংশ মানুষই তাদের সারাদিনের ক্লান্তি ঝেরে বিশ্রাম নিতে ব্যাস্ত। যেখানে সবাই ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সেখানে কষ্টকে
বুকে চাপা দিয়ে আরো একটি নির্ঘুম রাত কাটানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে শোবার প্রস্তুতি নিলো এলি।
কিন্তু এদিকে শাকিলের চোখে ঘুম নেই। পায়চারি করতে লাগলো সে সারারুম জুড়ে।
হঠাৎ শাম্মির ডাকে পেছনে তাকালো সে। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতেই শাম্মি বললো-
চেয়েছিলাম তোকে সবটা বলবোনা। কিন্তু আজ বলতে হবে।
-আপু কি হয়েছে তোমার? ভেতরে এসে বসো।
.
বিছানার উপর শাম্মি বসতেই শাকিল তার দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিলো। পুরো এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিলো শাম্মি।
তার হাত থেকে পানির গ্লাসটা টেবিলের উপর রেখে চিন্তিত স্বরে শাকিল বললো-
আপু এমন দেখাচ্ছে কেনো তোমাকে?
-আমার পাশে আয়।
.
শাম্মির পাশে শাকিল গিয়ে বসতেই সে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো-
তুই মাকে ভুল বুঝেছিস শাকিল। সবটা তুই জানিস না।
-কি জানিনা?
-আসল সত্যিটা।
.
(চলবে)

Comments
Post a Comment