১০১ তম - শাহেদুল ইসলাম মাহিম (পর্ব ২)


রাত দেড়টা।
ফাহাদের চোখে ঘুম নেই, খুব ভয়ে আসে সে।লাশ ঘরের ভেতর থেকে যে খবরটা দিয়েছিলো নতুন লাশ এসেছে মাসুদ ভাই, সেও এখন লাশ।
কারণ আজকের ডিলটা মাসুদ ভাইয়ের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো।
আর এই প্রথম ফাহাদ নিজে খুন করে নিজেই লাশ কাটার কাজ করেছে।
ক্রাইম দুনিয়া থেকে যতই সে বেরিয়ে আসতে চাইছে ততই সে এসবের মাঝে জড়িয়ে যাচ্ছে।
তবে ফাহাদের ভয় এখানে ফাহাদ মিথ্যে বলেছে, লোকটা কতো কান্নাকাটি করলো সবার পায়ে ধরলো কিন্তু মাসুদ ভাই ফাহাদকেই বিশ্বাস করেছে।
আর যদি জানে যে ফাহাদ মিথ্যে বলছে তাহলে হয়তো নেক্সট ডিলে তারই.........
না না এসব কি ভাবছে সে!
ঠিক তখনই তার মেয়েটির কথা মনে পড়লো।
সব দোষ সেই মেয়েটির। কিন্তু মেয়েটিই বা কি করলো?
সে তো মৃত! আর ফাহাদ কেনো মৃত একটি মেয়ের জন্যে এসব করছে?
হাজারো প্রশ্ন হয়তো তার মনে জন্ম নিতো, কিন্তু ক্লান্ত শরীর বিছানাতে এলিয়ে পড়াতে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায় সে।
.
.
বেলা ১২টা
হঠাৎ হকচকিয়ে ঘুম থেকে উঠে পড়ে সে।
কাল রাতের মতো আবারো অঝোর ধারায় ঘামছে সে!
এদিক ওদিক তাকিয়ে রান্না ঘরের দিকে দৌড়ে যায় বড় মাটির কলসটি আলগে ধরে একটানা পানি পান করতে থাকে যেনো সবে মাত্র রোজা শেষ হলো তার।
একটা সময় কিছু না ভেবেই প্রায় এক কলসি পানি মাথার উপর ঢেলে দেয় সে।
হাত দিয়ে নাক মুখ থেকে পানি সরাতে সরাতে তার বোকামির কথা মনে পড়লো।
সব কিছ পরিষ্কার করে এসে বিছানায় বসতে গেলে তার কিছু মনে আসে।
হ্যাঁ কাল রাতে সে একটা স্বপ্ন দেখেছে।
আর স্বপ্নে সে মেয়েটিও ছিলো।
তবে সব থেকে নিখুঁত ভাবে খেয়াল করার বিষয়টি হলো মেয়েটি সেখানেও মৃত অবস্থায় ছিলো।
ফাহাদ আসতে আসতে কাল রাতের পুরো স্বপ্নটা পরিষ্কার ভাবে মনে করতে পারলো।
সে দেখেছিলো তারা কোথাও বেড়াতে যাচ্ছে,গাড়ি করে।
ফাহাদ ড্রাইভিং সিটে আর পেছনের সিটে মেয়েটি শুয়ে আছে।
আর অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে ফাহাদ নিজে নিজেই সব কিছু বলে যাচ্ছিলো।
যেমন
আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।
ফাহাদ ভেবে নেয় যে মেয়েটি কিছু একটা বলেছে এরপর আবারো বলে উঠে ,
না না আমাকে সুন্দর বলছো কেনো?
আমার চেয়ে তুমিই অনেক সুন্দরী।
অর্থাৎ ফাহাদ ভাবে মেয়েটি তাকেও সুন্দর বলেছে।
একটা জিনিস ফাহাদ খেয়াল করলো মেয়েটির নাম সে কিছুতেই মনে করতে পারছে না।
কিন্তু তার স্পষ্ট এটি মনে আছে স্বপ্নে মেয়েটিকে সে কি যেনো একটি নাম ধরে ডেকেছিলো।
নাহ এভাবে হচ্ছে না! আরো গভীর ভাবে ভাবতে হবে। যে করে হোক ফাহাদ মেয়েটির নাম চায়-ই চায়।
আজ সারাটা দিন গেলো ফাহাদের শুধু মেয়েটির নাম ভাবতে ভাবতে।
সন্ধ্যে নামতেই মাসুদ ভাইয়ের ফোন। তবে আজ ফাহাদ সেখানে না যাওয়ার জন্যে অসুস্থতার বাহানা দেয়।
মাসুদ ভাই আসতে চাইলেও না করে দেয়।
কারণ ফাহাদ আজ সেই মেয়েটির কাছে যাবে।
আবারো ফাহাদ ভাবছে কেনো যাবে ফাহাদ সেখানে?
কিন্তু কিছুতেই উত্তর মেলাতে পারে না সে।
তবে জানে তার যে সেখানে যেতেই হবে।এদিকে মাসুদ ভাই যদি একবার জানতে পারে তাহলে খুব রেগে যাবেন আর মাসুদ ভাইয়ের রাগ হওয়া মানে অযথা খুন হওয়া।
কিন্তু কিছুই করার নেই, এক অজানা শক্তি ফাহাদকে টানছে।
ভূতপ্রেত ভূতের আছর এসবে কিছুতেই বিশ্বাসী না ফাহাদ।
কিন্তু আজ কেনো যেনো এসব জানতে তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে।
গা ঢাকা দিয়ে লাশ ঘরের ভেতর ঢুকে পড়ে ফাহাদ।
চোরা রাস্তা জানা থাকাতে ভেতরে আসতে ফাহাদের কোন অসুবিধে হয় না।
কিন্তু ধরা খেলে জামিন নেই।
ধরা খেলে ফাহাদ সেখানকার তাদেরই লোকাল মানুষ গুলো কে কি জবাব দিবে সে?
কারণ মাসুদ ভাইতো তাকে পাঠায় নি আর দলের সবাই জানে ফাহাদ গুরুতর ভাবে অসুস্থতায় ভুগছে।
এসবের ভয় নিয়ে সে লাশ ঘরে ঢুকে ১০১ নম্বর ফ্রিজ ড্রয়ারটি খুলে দেখে লাশটা সেই বরাবরই আছে। মুখের কাপড়টা একটু সরাতেই সেই মায়াবীনি চেহারার মায়াতে ফাহাদ আবারো হারিয়ে যায়।
ফাহাদের একসময় তাকিয়ে থাকা চোখ গুলো বড় বড় হয়ে যায় আর গা হাত কাপতে শুরু করে।
কারণ কাল ফাহাদ নিজেই ১০১ থেকে বের করে অন্য একটি ড্রয়ারে মেয়েটির মৃত লাশটি লুকিয়ে রাখে।
আর সেখানে এক সাথে দুটো লাশ ছিলো।
কিন্তু আবার ১০১ এ কেমনে চলে এলো।
ফ্রিজের ড্রয়ারটি খোলা হিম হিম বাতাস ভেতর থেকে আসছে তবুও ফাহাদ ঘামছে।
মেয়েটির দিকে আবারো তাকালো ফাহাদ কি নিষ্পাপ চেহারা তার।
তার দিকে তাকাতেই ফাহাদ যেনো সব ভুলে যায়।
কল্পনার এক রঙিন দেশে হারিয়ে যায় ফাহাদ।
কিন্তু শত চেষ্টা করে ফাহাদ নিজের কল্পনাতেও মেয়েটিকে জীবিত করতে পারেনি ফাহাদ।
ফাহাদ তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ঠিকই কিন্তু সে আর তার বাস্তবতায় নেই হারিয়ে গিয়েছে অনেক দূরে নীল ভাবনার গভীরতায়।
মৃত একটা লাশকে নিয়ে এমন সব উদ্ভট চিন্তা ভাবনা কি করে ফাহাদের মাথায় আসছে তা ফাহাদের মাথা কেটে দেখা উচিত বলে ফাহাদ মনে করবে।
তবে তা এখন নয়।
এখন তো সে দিব্যি ঘুরছে মৃত মেয়েটিকে নিয়ে।
সব ভাবনাতেই ফাহাদ একাই কথা বলে আর নিজের উত্তর নিজেই বানিয়ে বলে।
আর সব ক'টা ভাবনা ছিলো এমন মেয়েটি তার পাশে বসে আছে অথবা শুয়ে আছে কিন্তু ফাহাদ তাকে স্পর্শ করতে পারছে না। তার কাছাকাছি যেতে পারছে না।
যতই চেষ্টা করে ততটাই পেছনে সরে আসে ফাহাদ।
মনে হচ্ছে যেনো ফাহাদ তার নিজের কল্পনার রাজ্যের রাজা নয়।
কেও তাকে এসব ভাবাচ্ছে বা কিছুটা নিছক স্বপ্নের মতো।
যা খুব স্পষ্ট ভাবেই ফাহাদ দেখতে পাচ্ছে।
ফাহাদ কি যেনো মনে করে মেয়েটিকে কোলে নিয়ে কাল রাতের মতো আবারো স্ট্রেচারে রাখে।
কিন্তু রাখার আগে কোলে নিয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকাতেই ফাহাদ আবার কল্পনার দেশে হারিয়ে যায়।
এবারের কল্পনাটি ছিলো ফাহাদের জন্যে চমৎকার।
ফাহাদ মেয়েটিকে কোলে নিয়েই হাটছে ঘুরছে এখানে যাচ্ছে ওখানে যাচ্ছে।
কিন্তু বরাবরের মতোই মেয়েটি মৃত।
আসতে আসতে কোল থেকে নামিয়ে স্ট্রেচারে রাখতেই,
হঠাৎ মোবাইলটি ভাইব্রেশনে কেপে উঠলো।
সাথে ফাহাদও।
স্ক্রিনে মাসুদ ভাইয়ের নাম্বার দেখা যাচ্ছে।
এই রে!!!
মাসুদ ভাই কোন ভাবে জেনে যায়নি তো যে ফাহাদ এখানে এসেছে!
তাও এই মেয়েটির জন্যে???

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)