ফিরে পাওয়া সেই অতীত - সাজি আফরোজ (পার্ট ২)


দুই পরিবারেই নিপাদের সম্পর্কের কথা জানলেও তাদের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি পায়নি কখনো।কারণ তারা সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলো।ডিগ্রি পাশ করে তনয় ছোটখাটো চাকরী করছিলো একটা।তাদের মতে এটিই সঠিক সময়।
তনয় তার মাকে নিপার কথা বলতেই তিনি নিপাদের বাড়িতে যান।গিয়েই নিপার মাকে বলেন-
কয়েক বছর আগে আপনি বলেছিলেন আমার ছেলে আপনার মেয়ে কে বিরক্ত করে।আমি বলেছিলাম তাদের মাঝে সম্পর্ক আছে।আপনি মানতে নারাজ ছিলেন আর বলেছিলেন আমার ছেলেকে আপনার মেয়ে কোনদিন ও দিবেন না।
-দেখুন এসব অনেক আগের কথা।নিপার জন্য অনেক ভালো ভালো ঘর আসছে।তবে ও তনয় কে ভালোবাসে।আমাকে বলেছে আপনি আসবেন।জোর করেতো মেয়ে অন্য কোথাও দিতে পারিনা।আসুন বসে আলোচনা করি এই বিষয়ে।
-আলোচনা করার তো কিছু নেই!আমি বলতে এসেছি আপনার মেয়েকে আমি আমার ঘরে নিবোনা।
নিপা সবটা শুনছিলো।

সে তাড়াতাড়ি তনয় কে ফোন করে।তনয় এসে তার মাকে নিয়ে যায়।নিপার পরিবার নিপার মুখের দিকে তাকিয়ে মেনে নিলেও তনয় এর মায়ের আচরণে তাদের মত পাল্টে যায়।এদিকে তনয় তার মাকে বুঝিয়ে রাজি করলেও নিপাদের বাসা থেকে জানিয়ে দেয় তারা তাদের মেয়ে কে এমন ঘরে পাঠাবেনা।এতে তনয় এর মা আবারো ক্ষেপে যায়।দুই পরিবার থেকেই জানিয়ে দেয় তারা রাজি নন।তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলে নিপা-তনয় এর চেহারা আর দেখবেনা তারা।
এদিকে তনয় যেমন বাড়ির একটা ছেলে নিপাও তাদের বাড়ির একটা মেয়ে।তনয় এর দূর্বলতা ছিল,তনয়দের বাসার অবস্থা ভালো ছিলোনা।নিপার দূর্বলতা ছিলো,নিপাকে তার মা বাবা কখনো ছেলের থেকে কম ভাবেনি।অনেক ভালোবাসা দিয়েছে তারা তাকে।
তাও নিপা রাজি তনয়ের সিদ্ধান্তে।যেকনো সিদ্ধান্তে সে সাথে থাকবে।তারা ঠিক করলো যেভাবে হোক এক পরিবার কে মানাতে হবে।যেকোনো এক পরিবার এগিয়ে গেলে কাজ হবে।কিন্তু তারা পারেনি পরিবারের কারো মন গলাতে।
অবশেষে তনয় নিপাকে বলে বিয়ে করে নিতে।নিপা তনয়কে অনেক বুঝিয়েছিল তার মা ক্ষমা চেয়ে নিলে সব ঠিক হয়ে যাবে।কিন্তু তনয় তার মাকে মানাতে পারেনি।এই অবস্থায় নিপাকে বিয়ে করলে নিপাও সুখী হতে পারবেনা।নিপারতো এসব প্রাপ্য নয়।তাই তার পরিবার তার জন্য যেটা ঠিক করবে সেটাই ওর জন্য ভালো হবে।
কিছুদিন পরেই নিপার বিয়ে হয়ে যায়।লুকিয়ে দেখতে গিয়েছিল তনয়।লাল শাড়িতে অনেক মানিয়েছিল তাকে।শুনেছিল পার্লারে সাজতে যায়নি।ঘরে সাজানো হয় তাকে।অবশ্য না সাজলে আরো ভালো দেখায় তাকে।মেয়েটা চোখ দুটো ফুলিয়ে ফেলেছিল কাঁদতে কাঁদতে।কাজল গুলো চোখের নিচে কালো পানির মত ঝরছিল।বেশিক্ষণ দাঁড়াতে পারেনি তনয়।না নিপার পাশে কাউকে সে দেখতে পারবেনা তাই বর আসতেই চলে গিয়েছিল।
এসব ভাবতে ভাবতে চোখে পানি চলে আসে তনয় এর।আজ একটা বছর হয়ে গেলো।যাকে ছাড়া এক সেকেন্ড চলা যেতোনা তাকে ছাড়া একবছর কাটিয়ে দিয়েছে সে।
আচ্ছা আজতো রাসেল-নিপার বিবাহ বার্ষিকী।রাসেল কি তাকে সারপ্রাইজ দিবে!সারপ্রাইজ যে বড় পছন্দ নিপার।
এই এক বছরে রাসেল নিপার অনেক ভালো বন্ধু হয়ে যায়।এইতো সেদিন নিপার জন্মদিনে কেক,তার প্রিয় ফুল,প্রিয় রঙ এর শাড়ি এনে চমকে দিয়েছিল তাকে।নিপার ভাইয়ের থেকে তার জন্মদিন এর তারিখ টা জানা।সবদিকেই খেয়াল রাখে এই মানুষটা।ভাবতেই মুখে হাসি ফোটে নিপার।হাসি না থামতেই কেউ তার চোখ চেপে ধরে।এই ভর দুপুরে রাসেল ছাড়া আর কে হতে পারে!চোখ খুলতেই রাসেল তার গলায় N.R লিখা একটা লকেট পরিয়ে দেয়।আর কানে ফিসফিস করে বলে,"Happy Anniversary Nipa"....
নিপার মনে ছিলোনা।সে এই দিনটাকে মনে রাখতে চায়না।বন্ধু হিসেবে মেনে নিলেও স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারেনি রাসেল কে।একবছর আগের কথা মনে হতেই তার চোখ ছলছল করে উঠে।রাসেল বুঝতে পেরে এমন একটা প্রশ্ন করলো যেটার জন্য সে প্রস্তুত ছিলোনা।
-আমি কি স্বামী হিসেবে খুব অযোগ্য নিপা??
কিছুক্ষণ চুপ থেকে....
-এমন প্রশ্ন হঠাৎ?
-না জানার কথাতো নয় নিপা।তোমাকে কখনো এই বিষয়ে প্রশ্ন করিনি।তবে আজ আমার জানতে হবে এই এক বছরেও কেনো আমি তোমার মনে জায়গা করতে পারিনি।আমি দেখতে খারাপ বলে?
-আমি কখনো মানুষ এর চেহারা কে প্রাধান্য দিইনি।তনয় ও কালো ছিল।
-কে??
-আমার এক্স।জানতে চেয়েছেন বলে বলছি আজ।
(একে একে সব জানায় রাসেল কে।)
-মানলাম আগে সুযোগ হয়নি নিপা।এতদিন বলোনি কেনো?তুমি কি আমাকেও ঠকাওনি গোপণ করে?
কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে চলে গেলো রাসেল।খুব কষ্ট পেয়েছে সে।
তাকে সব জানিয়ে ঠিক করলো নিপা!!
২মাস হয়ে যায়।এই ২মাসে রাসেল শুধু দরকারে নিপার সাথে কথা বলেছে।বাসায় ফেরে রাত করে।আগের মতো কিছু নিয়ে আসেনা,খেয়াল ও রাখেনা।
আচ্ছা কেনো মিস করছে এসব নিপা!সেতো তনয় কে ভালোবাসে।তাকে নয় তবে কেনো সে রাসেল কে মিস করবে!ভালোই তো হলো মানুষটা দূরে থাকে এখন।বউ বউ তাকে আর বিরক্ত করেনা।
কেটে যায় আরো ৩মাস।হঠাৎ একরাতে রাসেল এর শরীর খারাপ হয়।গায়ে হাত বুঝতে পারে নিপা জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে তার।
রাতে নিপা তার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো।হঠাৎ রাসেল নিপার হাত ধরে জ্বরের ঘোরে বলে উঠে-
নিপা তোমাকে খুব ভালোবাসি।আমাকে ছেড়ে যেওনা কখনো।
নিপার বুকে গিয়ে লাগে কথাটা।কেন যেনো এই মানুষটাকে তার আপন মনে হচ্ছে।
২দিন পর নিপাকে ডেকে রাসেল বলে...
-শুনেছি আমাকে অনেক সেবা করেছো।ধন্যবাদ।
-এটা বলার জন্য ডেকেছেন?
-না।দেখো নিপা এভাবেতো চলা যায়না।তুমি যদি চলে যেতে চাও তাহলে চলে যাও।তনয় এর সাথে কথা বলে আমাকে জানাও।আমি সাহায্য করবো।তবুও প্লিজ নিজের মনের বিরুদ্ধে এখানে থেকোনা।নিজেও ভালো থাকো আমাকেও থাকতে দাও।
কথাগুলো শুনে তার কষ্ট হলো অনেক।ভালোবাসার মানুষকে কেউ এভাবে বলতে পারে!
রাত ১২টায় রুমে ডুকলো রাসেল।নিপাকে দেখতে না পেয়ে বারান্দায় গিয়ে দেখলো নিপা কাঁদছে।
-কি হয়েছে নিপা?তনয় কিছু বলেছে?
-এই এক বছর ৫মাসে আমি একবারো তনয়ের সাথে কথা বলিনি।কেনো জানেন?আপনাকে ঠকানো হবে বলে।হুম আমি কষ্ট পেয়েছি।তবে আপনার অধিকার থেকেও আপনাকে বঞ্চিত করিনি।আমার অতীত টাই কি বড় হয়ে গেলো আজ?কি হতো টা কি জানিয়ে আপনাকে?আমিতো চেয়েছি তনয় কে ভূলে গিয়ে আপনাকে নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে,তাতে যদি আমার একটু সময় লাগে এতে এমন কি ক্ষতি হয়ে যেতো বলতে পারেন?আমিতো এই বাড়ির বউ হয়েই থাকতে চেয়েছি।হুম আমি আপনাকে শুরুতে বন্ধু ছাড়া কিছু ভাবিনি।কিন্তু এই কয়েকমাস এ একবছর আগের আপনাকে আমি অনেক মিস করেছি।জ্বরের ঘোরে যখন বলেছিলেন আপনাকে ছেড়ে কোথাও না যেতে ঠিক করেছিলাম নতুন করে কাউকে ভালোবাসব।
আর আপনি......
আর বলতে পারলোনা নিপা কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো।
রাসেল তার হাত ধরে বললো-
জ্বরের ঘোরে কেনো আমিতো এমনেই চাই তুমি আমায় ছেড়ে কোথাও না যাও।
-তবে যে চলে যেতে বলেছিলেন??
-আরে তাতো তোমাকে পরীক্ষা করার জন্য বলেছিলাম।তুমি কি করো দেখার জন্য।
-সত্যি?
-একদম।
হুম সেদিন থেকে নিপা আর রাসেল এর নতুন জীবন শুরু হয়।
ভালোই দিন যাচ্ছিলো তার দিনগুলো।
হঠাৎ একদিন নিপার বাড়ি থেকে ফোন এলো।
জানতে পারে নিপার বাবা আর এই পৃথিবীতে নেই।
তনয় সেদিন চেয়েছিলো নিপার সাথে দেখা করবে,তাকে শান্তনা দিবে।কারণ নিপা তার বাবাকে অনেক ভালোবাসতো।কিন্তু সে আড়াল থেকে দেখেছিল রাসেল নিপাকে শান্তনা দিচ্ছে,খেয়াল রাখছে।নিপার জন্য তনয় অনেক খুশি।সেদিন যাওয়ার ইচ্ছা থাকলে তনয় আর যায়নি নিপার কাছে।
আজ নিপা খুব সেজেছে।বাবার মৃত্যুর ৫মাস পর আজ তার বড় ভাইয়ের বিয়ে।চারদিকে হইচই চলছে।নিপাও খুশি।শুধু বাবার কথা মনে হতেই চোখে পানি চলে এলো।হঠাৎ রাসেল এসে তার চোখের পানি মুছে দিলো।
এই রাসেল টা কি নিপার ছায়া হয়ে গিয়েছে!
ভালোই কাটছিলো তাদের সময়।হঠাৎ রাসেলের মা নিপার কাছে আবদার করে বসে নাতী-নাতনীর মুখ দেখতে চায়।কিন্তু রাসেল চেয়েছিল তারা তাদের সময়গুলোকে আরো উপভোগ করবে।অনেক তো হল নাহ এবার রাসেল কে বলতেই হবে।রাসেল এর জন্য সারাদিন অপেক্ষা করলো নিপা।রাতে ডিনার করে রুমে আসতেই নিপা গিয়ে রাসেল কে জড়িয়ে ধরে।
-ওমা আজ আমার বউ এর রোমান্টিক মুড বুঝি?
-উহু না
-তবে?কিছু চায় নাকি?
-হুম চাই।
-কি?
-না মানে...
-আরে বলোনা।
-ফ্যামিলি প্লানিং করতে চাই।
রাসেল সেদিন নিপার কথা মেনে নিয়েছিলো।
রাসেল এর মা-বাবা নাতী/নাতনীর আগমণ এর জন্য অনেক আয়োজন করে রেখেছিল।
কিন্তু নিপার ভাগ্যে সুখ টিকেনি।
দেখতে দেখতে ২টা বছর কেটে যায়।রাসেল এর মা এর স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
ডাক্তার আজ জানিয়ে দিয়েছে নিপা কখনো মা হতে পারবেনা,সে ক্ষমতা তার নেই।
হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে নিজের রুমে নিপা।
শ্বাশুড়ী ডাইনিং রুম থেকে চেঁচিয়ে বলে চলেছে..
-এই কোন দিন দেখাইলা আল্লাহ্‌!কতো শখ করে সুন্দরী বউ ঘরে এনেছিলাম আর এই মেয়ে অভাগী.....
না আর শুনতে পারছেনা নিপা।দুকান চেপে ধরে কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে শুয়ে পড়লো।
রাসেল এসে তার অবস্থা দেখে পাশে যায় তার।মেঝে থেকে তুলে নিপার মুখটা তার বুকে গুজে।
-এই মেয়ে বাচ্চা ছাড়া মানুষ বাঁচেনা?
-
-কথা বলোনা কেন?মায়ের কথায় কষ্ট পেয়েছো?
-মাতো ভূল কিছু বলেননি।
-বলেছেন।ঠিক হয়ে যাবে সবটা।
এতদিন তনয়কে বিয়ের জন্য কেউ রাজি করাতে পারেনি।কিন্তু আর কতো!সে নিজেই ভাবছে সে কি নিপার জন্য অপেক্ষা করছে! কেনো করবে!নিপাতো সুখে আছে।তবুও কেনো মনে এতো আশা।না ঠিক হচ্ছেনা তার।নিপা আর কারো বউ।অনেকদিন আগেই সে আর কারো হয়ে গিয়েছে।এসব ভাবনা থেকে বের হয়ে আসার জন্য হলেও তনয় এর বিয়েটা করা দরকার।
তনয় মাকে গিয়ে জানালো মেয়ে দেখতে।যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে বিয়ে করতে চায়।
বেশ কয়েকটা দিন কেটে যায়।রাসেল এর মা উঠে পড়ে লেগেছে রাসেল কে আরেকটা বিয়েতে রাজি করানোর জন্য।তার কথা নিপাকে তারা তাড়িয়ে দিবেনা।সেও থাকবে।
খুব তর্ক হয় তাদের।রেগেমেগে রাসেল নিজের রুমে এসে দরজাটা বন্ধ করে বসে।
-মাতো খারাপ কিছু বলছেন না।শেষ বয়সে হলেও বাচ্চা লাগে।তুমি আরেকটা বিয়ে করো।আমার আপত্তি নেই।
-তুমিও আমার মাথাটা খারাপ করোনা নিপা!
সামনে থেকে যাও এখন।
নিপা চুপচাপ রাসেল কে একা থাকতে দিয়ে বারান্দায় চলে গেলো।আচ্ছা তনয় কি তাকে অভিশাপ দিয়েছে!না তনয় এমনটা করতে পারেনা।
তনয় আর নিপা ঠিক করে রেখেছিলো মেয়ে হলে মেয়ের নাম তনিমা আর ছেলে হলে ছেলের নাম তন্ময় দিবে।
রাসেল বলেছিলো নিপার ইচ্ছাতেই নাম দিতে তাই নিপা এই নামগুলো দিবে ভেবেছিলো।
ভাবতে ভাবতে তার ফোনটা বেজে উঠে।রুমে গিয়ে ফোন নিয়ে আবার বারান্দায় চলে আসে সে।দেখে তার পাড়ার বান্ধবীর ফোন।
-হ্যালো কেমন আছিস নিপা?
-ভালো।তুই??
-আছিরে।তনয় ভাইয়ার তো বিয়ে ঠিক হয়েছে।
-কি বলিস?
-হুম।এতোদিন পরে সে রাজি হয়েছে।বউ নিশ্চয় সুন্দরী হবে।
মানুষটা কালো হলেও চোখ সুন্দর।হিহি
-ভালো হয়েছে।আর কতো একা থাকবে।দোয়া করি সুখে থাক সে, দোয়া করি।
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)