ডিটেকটিভ তিশা - শাহেদুল ইসলাম মাহিম (পর্ব ৬)


তিশার মনে হলো পা থেকে যেনো জমিন সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
আর শূণ্য থেকে তাকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে কিন্তু সে জানে না কোথায় গিয়ে পড়বে।
হাটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়লো তিশা। ডায়েরিটা খুব জোরে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আছে এইবারে জোরে চিৎকার করে কান্না করতে চেয়েও পারেনি সে।
নীরবে কান্না করেই যাচ্ছে।
কতক্ষণ এইভাবে পার হয়ে গেলো জানেনা তিশা।
কি করবে তিশা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না।
......
মোবাইলটি নিয়ে শেষ বারের মতো বর্ণকে ফোন দেওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু সুইচড অফ।
তিশার আর কিছুর বোঝার বাঁকি রইলো না।
হুরাইরার রুমে গিয়ে খুব যত্ন করে ডায়েরিটি আগের মতো রেখে দিয়ে ছাদে চলে যায়।
তিশা মনে মনে ভাবে যে করেই হোক আজ রাতে সবটা তার জানতে হবে
......
রাত ১২টার দিকে তিশা গোডাউনের দিকে রওনা হলো।
নির্ঝন রাত তিশা হাটছে।
আর এখনো তার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
নিজেকে খুব অসহায় আর অপরাধী মনে হচ্ছে।
মনে হচ্ছে যেনো বর্ণ আর হুরাইরার মাঝে তিশা একটি দেয়াল।
হুরাইরা তো একবার বলতে পারতো?
ধুর কি বলবে এই যে বোনের বর কে ভালোবাসে!
গোডাউনের কাছাকাছি আসতেই তিশা দেখতে পেলো কে একটা যেনো খুব তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকে গেলো।
সাব্বিরকে ফোন দেওয়ার জন্যে মোবাইলটি হাতে নিলে তিশা ভাবে না এই লড়াই আমার।
আমাকে একাই লড়ে যেতে হবে।
......
তিশা আসতে আসতে গোডাউনের ভেতরে ঢুকে যায়।
তারপর ঐ উদ্ভট লোকটাকে দেখতে পায়। কিন্তু চেহারাটা ঠিক মতো বুঝা যাচ্ছে না।
পরণে লম্বা কোর্ট পুরো শরীর ঢাকা মাথায় টুপি মুখে মাস্ক সব থেকে বড় যে বিষয়টি তিশার নজর কাড়ে,
তার কোলে একটি বিড়াল।যার গলায় মিমির মতোই বেল্ট।
কিন্তু মিমি এখানে কীভাবে?
অন্ধকারে কিছুই বুঝা যাচ্ছিলো না।
লোকটা একটা রিমোট বের করে কি যেনো প্রেস করলো আর সাথে সাথে গ্রাওন্ড ফ্লোরে থাকা সিক্রেট দরজাটি খুলে গেলো।
ভিতর থেকে হালকা ধোয়া আর আর সবুজ আবছা আলো বের হচ্ছে যার মধ্যে লোকটি হারিয়ে যায়।
তিশা বুঝতে পারলো বেসমেন্টে সব কিছু হয়।
লোকটি নিচে নামতেই তিশাও সাথে সাথে নিচে নামতে লাগলো।
অনেকটা ল্যাবের মতোই মনে হচ্ছে তার।
তিশা খুব সাবধানেই পা বাড়াচ্ছে।
সব কিছু ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে দেখার পর ডিটেকটিভ তিশা বুঝতে পারলো এখানে একটি গ্যাং কাজ করে।
তবে আজ কেও নেই কেনো?
আর লোকটিই বা কোথায় হারিয়ে গেলো?
হাটতে হাটতে কিছুটা সামনে এগিয়ে এলে বর্ণের কন্ঠ শুনতে পায় তিশা।
....
- তুমি যা করতে চাচ্ছো তা কখনো সফল হবে না।
- আমার কথা ছাড় আগে নিজেকে কীভাবে বাঁচাবি সেটা চিন্তা কর।
তিশা তোকে দেখতেই গুলি করে উড়িয়ে দিবে।
আর এরপর তিশা হবে আমার।
হুরাইরাকেও রাস্তা থেকে সরানোটা খুব জরুরি।
কারণ তিশাকে অজ্ঞান অবস্থায় যখন বিছানায় রাখি তখন খুব ইচ্ছে করছিলো তিশার খুব কাছে যাওয়ার কিন্তু ঐ হুরাইরার জন্যে সম্ভব হলো না।
...
আড়াল থেকে সবটা শুনছিলো তিশা।
তাহলে এতোক্ষণ তিশা যা ভাবছে সব ভুল?
সবটা হারিয়েও যে সাথে ছিলো সেই কি না????
তিশার মনে হচ্ছিলো রিভলবারটি বের করে পর পর গুলি করে সব বুলেট সাব্বিরের দেহটাকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলুক।
এতোটা নিচ কেমনে হতে পারলো সে?
.....
তিশার আত্মহত্যা করতে মন চাইলো যারা তাকে এতো ভালোবাসতো তাদেরকেই সে ভুলে বুঝেছে?
তবে যে হুরাইরার মিমি এখানে?
হুরাইরার সেই ডায়েরিতে লিখা গুলো?
তারপর বর্ণের ল্যাবের দরজায় কেমিক্যাল?
তাহলে কি হুরাইরার সাথে সাব্বিরের কোন সম্পর্ক আছে?
আর যদি সাব্বিরের সাথে সম্পর্ক থাকতোই তাহলে তিশার কাছে হুরাইরার পর্দা সরানোর কি দরকার??
তিশার মাথা যেনো এই ফেটে যাবে।
তখনই সাব্বির বর্ণকে বলে এইটা লাস্ট ফরমুলা এরপর তোমাকেও আর দরকার নেই।
তিশা এইবার একটু দেখার চেষ্টা করতে লাগলো ভিতরে কি চলছে।
কিন্তু তিশা লক্ষ্য করলো একটি ছায়া ঘন হয়ে আসছে।
অর্থাৎ রুমটা থেকে কেও একজন বের হবে।
তিশা তাড়াতাড়ি আড়ালে সরে যায়।
সাব্বির গোডাউন থেকে বেরিয়ে যায়।
তিশা রুমের ভেতরে গিয়ে দেখে চেয়ারে বাঁধা অবস্থায় বর্ণ ঝিমুচ্ছে।
এ কি অবস্থা তার! ঠোট ফেটে রক্ত ঝরছে।
চোখের নিচে কালো রক্ত জমাট বাধানো।
যেনো এ কয়েকদিন খুব অত্যাচার করা হয়েছে তার উপর।
তিশা বর্ণ বলে ডাক দিয়ে দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরে।
বর্ণ চমকে উঠে,
- তিশা! তিশা তুমি এখানে কীভাবে?
ওরা আমাকে এখানে এনে অপকর্ম করতে বাধ্য করেছে।
একটু ফাঁক পেতেই তোমাকে আজ ফোন করেছিলাম কিন্তু তুমি তুলোনি। সেদিন ভিডিও কলেও ওরা আমার সামনে বন্দুক তাক করে রেখে কথা বলিয়েছিলো।
অনেকটা কান্না জড়িত গলায় আর হাপিয়ে হাপিয়ে কথা গুলো বলছিলো বর্ণ।
তিশা বর্ণকে আরো জোরে চেপে ধরে রেখে,
- আমাকে মাফ করে দাও বর্ণমালা। আমি সত্য মিথ্যার খেলায় তোমাকেই মিথ্যে প্রমাণিত পেয়েছি। আর সে জন্যই তখন তোমার ফোন রিসিভ করিনি।
.
.
.
- কিন্তু তুমি এক বারো বুঝলে না?
যে যায় বললো তা-ই বিশ্বাস করে নিলে?
- কি করবো বলো? সবকিছু তোমার দিকেই ইশারা করেছিলো আমি বার বার তোমাকে দোষী পেয়েছি
-কিন্তু কীভবে?
বর্ণের বাধন খুলে দিতে দিতে,
- আমি আমিন সাহেবের ব্যাগ থেকে একটা ড্রাগের প্যাক আর টাকার বান্ডেল উঠায় সেখানে তোমার হাতের ছাপ পাওয়া যায়।
- আচ্ছা তুমি কি নিজ চোখে দেখেছো?
তিশা কিছুটা নিচু স্বরে কান্না জড়িত কন্ঠে না।
কিন্তু মিমির গলায় যে বেল্টটি আছে সেটার মাধ্যমেই তো ও এতো বড় হিংস্র প্রাণী হয়ে উঠে।
- হোয়াট? মিমির গলায় যে বেল্টটি দেখছো সেখানে একটা লোকেশন ট্রেকার আমি সেট করে দিয়েছিলাম।
কারণ হুরাইরা আমাকে বলেছিলো মিমি আজকাল বাড়ির বাইরে চলে যায়।
আর তুমি যেটাকে মিমি মনে করছো সেটা মিমি না।
সাব্বিরের পোষা বিড়াল মিনি।
- ওহ মাই গড!!!
তাহলে সেদিন রাতে হুরাইরা তোমার ল্যাবের দরজা কেমিক্যাল দিয়ে গলিয়ে ফেলে।
- তিশামণি তুমি কি দেখেছো সেটা?
- নাহ!!!
- শোন আমি যেদিন এখানে আসবো সেদিন আমার চাবিটি হারিয়ে যায় আর আমি যদি কিছু দিয়ে সেটা ভাঙ্গার চেষ্টা করতাম তাহলে তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতো।
আমার কিছু জরুরি ফাইল সেখানে আমি তাড়াহুড়ো করে সেখানে রেখে লক করে দিয়েছিলাম পরে চাবি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তবে আমার ল্যাবে হুরাইরার কি কাজ সেটা একমাত্র সেই-ই বলে পারে।
আর আমাকে বলা হয়েছিলো একটা বিদেশী ফরমুলাকে কপি করে অনেক গুলো বানিয়ে দিতে হবে। যা আমার জন্যে মোটেও মুশকিল ছিলো না।কারণ আমি মিমির ফিটনেস নিয়ে কিছুটা কাজ করেছিলাম।আর এই ফরমুলাটিও অনেকটা মিল আছে এর সাথে।
কিন্তু এই ফরমুলাটি আমার ফরমুলা থেকে অধিক শক্তিশালী।
প্রথম প্রথম আমিও বুঝিনি পরে যখন বুঝতে পেরেছি আমাকে এখানে নিয়ে আসা হয় আর জোর পূর্বক এসব করায়।
তিশা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
বর্ণ- মন খারাপ করে না আমার টিসু। আমিও তোমার জায়গায় থাকলে ঠিক একই কাজ করতাম।
তোমার জন্যে আরকটা শকিং নিউজ আছে?
- আর কি বাঁকি আছে!!
- হুম।
আমিন সাহেব সাব্বিরের বাবা।আর সাব্বিরই আমিন সাহেবকে খুন করেছে।
কারণ আমিন সাহেব ছিলো সাব্বিরের পথের কাটা।
তুমি সেদিন আমিন সাহেবকে ভুল বুঝেছিলে।
তুমি না আমরা সবাই-ই।
-কিইইইই!!!!!
চলবে.........

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)