শেষ থেকে শুরু - সাজি আফরোজ (পর্ব ৩)
মিনু আর ফিরোজ অনেকক্ষণ যাবৎ একই রুমে বসে আছে। কিন্তু কারো মুখে কোনো কথা নেই।
মিনুর বাসায় মিনুকে দেখতে এসেছে মায়ের সঙ্গে ফিরোজ। গুরুজনেরা তাদের আলাদা একটা রুমে পাঠিয়েছেন দুজন দুজনের সাথে পরিচিত হয়ে আলাপ করার জন্য। সেই ক্ষেত্রে ছেলে হিসেবে ফিরোজের কথা বলা শুরু করা উচিত। কিন্তু মিনু দেখতে পেলো ফিরোজ কাঁপছে।
.
ফুল স্পিডে মাথার উপর ভনভনিয়ে ফ্যান চললেও কুল কুল করে ঘামছে মিনু। আর এই গরমের মাঝে কিনা ফিরোজ কাঁপছে! তার কি কোন রোগ রয়েছে? এক দৃষ্টিতে ফিরোজের দিকে তাকিয়ে এসব ভাবতে থাকল মিনু।
.
আকাশ সমান জড়তা নিয়ে বিছানার এক কোণায় বসে আছে ফিরোজ। খুব বেশি অসহায় লাগছে তার নিজেকে। এসবই কি হওয়ার ছিলো! সেতো তার ক্ষুদ্র জীবনে ক্ষুদ্র চাওয়া-পাওয়ার মাঝে জীবন সাজাতে চেয়েছিল এলিকে ঘিরে। অথচ এখন কোথায় সে আর কোথায় বা এলি! দু'জন দু'পথের মাঝি। অবশ্য তা ২০বছর আগেই হয়েছিলো। কিন্তু আজ তার এতোটা খারাপ লাগছে কেনো? নিজের বিয়ের কথা ভেবে? সে মিনুকে স্ত্রীর অধিকার, ভালোবাসা দিতে পারবে তো? উত্তরে বুকের গহীন থেকে বেরিয়ে আসা একটি নিঃশ্বাস ছাড়লো ফিরোজ।
.
-আপনি ঠিক আছেন? মনে হচ্ছে শরীর খারাপ আপনার।
.
পাশ ফিরে মিনুর দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় ফিরোজ বললো-
আমি স্বাভাবিক আছি।
-মোটেও না! হাতপা কাঁপছে আপনার।
.
মিনুর কথা শুনে নিজের দিকে নজর দিল ফিরোজ। হ্যাঁ.. সে কাঁপছে।
-পানি খাবেন?
ভীত গলায় ফিরোজ বললো-
-হুম।
.
মিনু পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই, এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে গিলে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টায় লেগে পড়লো ফিরোজ।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে মিনুর উদ্দেশ্যে বললো-
ধন্যবাদ।
-হুম।
-ভালো আছেন?
-জ্বী, আপনি?
-আছি।
-বিয়ে কেনো করেননি এতোদিন?
.
মিনুর করা প্রশ্নে খানিকটা নড়েচড়ে বসলো ফিরোজ। না চাইতেও মুখ দিয়ে বেড়িয়ে পড়লো তার-
মনটা কাউকে দিতে পারবো না বলে করা হয়নি।
.
ফিরোজের কথা শুনে মিনুর বুঝতে বাকি রইলো না সে কি বোঝাতে চাইছে।
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে ফিরোজের উদ্দেশ্যে মিনু বললো-
আপনাকে কি জোর করে আনা হয়েছে এখানে?
-নাহ। মায়ের কথা রাখতে গিয়েই আসা।
-হুম।
-সবটা জেনে আপনি যদি বিয়েটা করতে রাজী হন তবে আমার কিছু বলার নেই। আসি আমি।
.
ফিরোজ রুম থেকে বেরিয়ে পড়তেই মুখে মুচকি একটা হাসির রেখা ফুটলো মিনুর। যাকে ভালোবাসতো তার জায়গা অন্য কাউকে দিতে হবে বলে এই লোক বিয়েই করেনি। ইন্টারেস্টিং না! তার মানে এই লোকের মনে যদি জায়গা করা যেতে পারে সহজে সে জায়গায় অন্য কেউ বসতে পারবেনা। সে কি চেষ্টা করে দেখবে, ফিরোজের মনে নিজের জায়গা তৈরী করার?
.
.
.
আজ সারাদিন শাম্মিকে চুপচাপ দেখছে এলি। নিজের রুম থেকে প্রয়োজন ছাড়া বেরই হয়নি সে।
মেয়েটার হঠাৎ কি হলো তা জানার জন্য শাম্মির রুমে প্রবেশ করলো এলি। রুমের কোথাও শাম্মিকে দেখতে না পেয়ে বারান্দায় এগিয়ে গেলো সে।
বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে শাম্মি। তার পাশে এসে এলিও হাত রেখে গ্রিলের উপর শাম্মির উদ্দেশ্যে বললো-
তারা গুনছিস?
-নাহ। চাঁদ দেখছি।
-মন খারাপ?
-না।
-সাব্বিরের সাথে ঝগড়া হয়েছে?
-না।
-সাব্বিরের কোনো খবর নেই, তার না বাসায় তোদের কথা জানানোর কথা ছিলো? আমি একটা ফোন দিয়ে দেখি।
.
এলি বারান্দা ছেড়ে বেরুতে চাইলে শাম্মির ডাকে থেমে পেছনে তাকিয়ে বললো-
কি?
-সাব্বিরকে ফোন করোনা মা।
-কেনো?
-আমি বলছি তাই।
-ঠিক আছে করবোনা। কিন্তু কি হয়েছে তা কি জানতে পারিনা?
.
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবার আকাশ পানে তাকালো শাম্মি। ধীর গলায় মায়ের উদ্দেশ্যে বললো সে-
সময় হলে বলবো।
.
.
.
-অবশেষে আমার আশা পূরণ হতে চলেছে। তোর বিয়েটা হলেই শান্তিতে মরতে পারবো আমি।
.
মায়ের কথা শুনে চিন্তিত কণ্ঠে ফিরোজ বললো-
মিনু কিছু জানায়নি?
-তার তোকে ভালো লেগেছে।
.
খানিকটা অবাক হলো ফিরোজ। এতোকিছু জানার পরেও এই মেয়ে এতো সহজে কিভাবে রাজী হতে পারলো!
-ফিরোজ?
.
মায়ের ডাকে মাথা নেড়ে ফিরোজ বললো-
হুম?
-কালই নিশানা দিয়ে আসবো মেয়েকে। তারপর খুব তাড়াতাড়ি তোদের বিয়ের আয়োজন শুরু করবো।
.
মায়ের কথা শুনে তাদের পাশে বসে থাকা ফিরোজের ছোট ভাই ফারহাজ বলে উঠলো-
অবশেষে বড় ভাইয়ের বিয়েটা হচ্ছে তাহলে! আমারতো ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছে করছে মজা করার জন্য।
-তুই কি বড় নাকি! আমার ছোট ছেলেই তো!
.
উচ্চশব্দে হেসে উঠলো ফারহাজ। হাসতে হাসতেই সে বললো-
বয়স কি কম হয়েছে মা! আমার নিজেরি বড় বড় ছেলেমেয়ে আছে।
-তবুও তোরা আমার কাছে ছোট থাকবি। এখন বউ মা কে ডাক দে। কালকে মিনুদের বাসায় কি কি নিয়ে যেতে হবে একটা লিস্ট করি।
.
.
নিজের রুমে চলে আসলো ফিরোজ। হাতের ঘড়ি খুলে মেঝের উপর ছিটকে ফেলে চোখজোড়া বুজে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলো সে। যা হচ্ছে তা সে মেনে নিতে পারছে না।
রাগ হচ্ছে, কষ্ট হচ্ছে তার। নিজের মনকে নানানরকমের বুঝ দিলেও কোনো যুক্তিরই পাত্তা দিচ্ছে না তার অবুঝ এই মন। এ কেমন এক অসহায় পরিস্থিতির মাঝে সৃষ্টিকর্তা ফেললেন তাকে!
এর থেকে পরিত্রাণের কি কোনো উপায় নেই!
.
.
.
ছাদে একাএকা দাঁড়িয়ে রয়েছে সাব্বির। সবেমাত্র মাকে জানিয়ে এসেছে শাম্মির সাথে বিয়ের কথা এখন না আগালেই ভালো হবে।
আসলেই কি এমনটা চেয়েছিলো সে? মোটেও না।
খুব তাড়াতাড়ি শাম্মিকে নিজের করে পেতে চেয়েছিলো সাব্বির। সংসার জীবনে পদার্পন করে জীবনের নতুন এক অধ্যায় শুরু করতে চেয়েছিলো সে। তবে সব চাওয়া যে পূর্ণতা পায়না এটা তার অজানা ছিলো। যে খেলায় শাম্মি নেমেছে এতে শুধু তার মায়ের মন না, অনেক কিছুই এলোমেলো হয়ে যাবে। সবেতো মাত্র শুরু। এই সমাজ যে মন বুঝেনা। বুঝে যুক্তি। কি যুক্তি দিবে সবার কাছে শাম্মি এই ব্যাপারে? আদৌ সফল হতে পারবে কি সে?
.
আনমনে এসব ভেবে আকাশের বুকে থাকা চাঁদের দিকে নজর দিলো সাব্বির।
শাম্মীর সাথে কথা না হলে যেনো আকাশের চাঁদটাও দেখতে ভালো লাগেনা তার।
.
.
.
বিছানায় অনেকক্ষণ শুয়ে থাকলেও ঘুমটা একদমই আসছেনা ফিরোজের। চোখ জোড়া খুলে সে বসে পড়লো বিছানার উপরে। পকেটের ভেতর থেকে মোবাইলটা বের করে ভাবলো কিছুক্ষণ ফেবুতে সময় কাটানো যেতেই পারে।
.
মেসেঞ্জার চালু করতেই ইনবক্স ভর্তি মেসেজ দেখতে পেলো ফিরোজ। কিন্তু তার কেনো যেনো পরিচিত মানুষগুলোর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছেনা। সকলেই একটা কথা শুরুতেই জানতে চাইবে। আর তা হলো- কেমন আছো ফিরোজ?
কি জবাব দেবে সে? ভালো আছি? এটা যে মনের কথা নয়। মিথ্যে বলার দরকার টাই বা কি!
.
আপনমনে এসব ভেবে মেসেজ রিকোয়েস্ট এ চোখ পড়তেই শাম্মির মেসেজ দেখতে পেলো ফিরোজ।
শাম্মির দেওয়া মেসেজটা পড়ে বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে গেলো সে।
এলির মেয়ে শাম্মি কেনো তাকে নক করতে পারে!
রিপ্লাই দিয়ে কি দেখবে সে?
.
(চলবে)

Comments
Post a Comment