বৈধ সম্পর্ক - সাজি আফরোজ (পর্ব ১০)
অপরিচিত একটা ছেলের মুখে নিজের নাম শুনতে পেয়ে অনেকটায় অবাক হয়ে যায় মুনিরা।
-আপনি মুনিরা না?
-হুম।কিন্তু আপনি কে?
-আমি পাবেল।
-সায়নী আপুর ফুফাতো ভাই নাকি?ওহ দুঃখিত উনার হবু স্বামী?
-জ্বী।
-কিন্তু আপনি আমাকে কি করে চেনেন?
-আনাস আমার বন্ধু ছিলো।স্কুলে একসাথে পড়েছি আমরা।
মুনিরাকে চুপ থাকতে দেখে পাবেল আবার বলতে শুরু করে-
আসলে আনাস শহরের স্কুলে মামার বাসায় থেকে পড়াশোনা করতো।তখন আমরা ফ্রেন্ড হয়েছিলাম।যদিও সে গ্রামের ছেলে আমি শহরের,পরবর্তীতে সে ডুবাই চলে যায় আর আমি আমেরিকায় তবুও আমাদের মাঝে যোগাযোগ ছিলো।আর আনাস আমাকে আপনার ছবি দিয়েছিলো আপনাদের বিয়ে ঠিক হওয়ার পরে।তাই আপনাকে দেখে চিনে ফেলেছি আমি।
-ওহ।
-কিন্তু আপনি এখানে?
-জ্বী সায়নী আপুর খালাতো ভাইয়ের সাথেই আমার বিয়ে হয়েছে।
-ও আচ্ছা।
-দুঃখিত অনেকক্ষণ দাঁড় করিয়ে রেখেছি আপনাকে।ভেতরে আসুন।
-আরে না ঠিক আছে,চলুন।
পাবেলের মুখে আনাসের কথা শুনে মুনিরার মনটা খারাপ হয়ে যায়।
আচ্ছা আনাস কি সত্যি সে অপয়া বলেই মারা গিয়েছে!
মুনিরা এক পা বাড়ানোর সাথে সাথে আবার কলিং বেল বেজে উঠে....
সে খুলে দিতেই আফরান কে দেখতে পায়।
-এসেছেন এতক্ষণে!জানেন আজ বাসায় মেহমান আছে?
-কেউ বললেইতো জানবো।
-বলতে চেয়েছিলাম কিন্তু আপনি ফোন দিতে নিষেধ করেছিলেন বাইরে থাকা অবস্থায়।
-কে এসেছে?
-সায়নী আপুর ফুফুরা।
ভ্রু জোড়া কুচকে আফরান প্রশ্ন করে-
পাবেল এসেছে?
-উনি মাত্রই আসলো।উনার বাবারা দুপুরের আগে এসেছেন।
-ওহ।
হাসির মা পাবেলকে দেখে ছুটে চলে যায় সায়নীর রুমে....
তার কাছে গিয়েই হাঁপাতে হাঁপাতে বলে-
আপা মনি?
-কি ব্যাপার হাঁপাচ্ছো কেনো?
শরীর খারাপ?
-আরেনা।তোমার হবু বর আইসা পরছে।
-পাবেল?
-হো।
-ও আচ্ছা।
-যে সুন্দর।আমেরিকার পোলার মতন।তোমার সাথে মানাইবো খুব।
-এটা বলার জন্য ছুটে আসতে হয়?পড়ে গেলে কি হতো শুনি!
-আমিতো তোমারে তাড়াতাড়ি বলতেই ছুইট্টা আসলাম।যাও উনার কাছে।
সায়নীর মোটেও ইচ্ছে করছেনা পাবেলের কাছে গিয়ে ফালতু প্যাঁচাল করতে।
-আপা মনি যাওনা।আমি আফরান ভাইরে ভেতরে চলে যায়তে বলি।
-আফরান এসেছে?
-হো,ভাইজান তো তোমার হবু বরের পাশেই আছে বসার ঘরে।
-বাকি সবাই?
-তোমার খালুর ঘরে।
-আচ্ছা থাক।যেতে বলিওনা ওকে।
সায়নী নিজের চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে চোখে হালকা কাজল দেয়।ঠিক করে আফরান কে তার শাস্তি দিতেই হবে।লম্বা একটা দম ফেলে এগিয়ে যায় ড্রয়িং রুমের দিকে।
-হ্যালো পাবেল?
সায়নীকে দেখেই দাঁড়িয়ে যায় পাবেল।
মুচকি একটা হাসি দিয়ে বলে-
কেমন আছো সায়নী?
-এইতো ভালো।আপনি?
-ভালোই।
-দাঁড়িয়ে কেনো গিয়েছেন!প্লিজ বসুন।
-কিন্তু তুমি?
-হুম আমিও বসবো।
পাবেলের পাশে গিয়ে সায়নী বসতেই আফরানের চোখ দুটো লাল হয়ে যায়।
-আপনি এতো দেরী করে কেনো এলেন?
-আসলে আমার একটা বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ে যার জন্য.....
-ঠিক আছে।ভালোই হলো তখন আসেন নি।
-মানে?
-আসলে আমি তখন রান্না করিনি।এখন রান্না করবো আপনার জন্য।কি খাবেন বলুন?
-তোমার যা খুশি রাঁধো।
-আচ্ছা তাহলে আপনারা গল্প করুন,আমি আসি।
কি করে আমার সামনে সায়নী অন্য একটা ছেলের পাশে গিয়ে বসে এসব কথা বলতে পারছে!শুধু মাত্র আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য!হুম হুম শাস্তি,তবুও কেনো আমার এতো খারাপ লাগছে!এসব ভেবে ভেবে আফরানের বুকের ভেতর উতাল-পাতাল করছে।সঠিক সময়ের অপেক্ষা করতে করতে সায়নী যদি পাবেলের হয়ে যায়!না কিছুতেই না।সায়নী শুধু তার।
-আপু আমি সাহায্য করি?
-আসলে আমি আমার হবু বরের জন্য নিজেই কিছু করতে চাইছি।কোনো সাহায্য লাগবেনা আমার।
-কিন্তু তোমার শরীরটা দূর্বল।
-কিচ্ছু হবেনা।এতো ভেবোনা।তুমি বরং অন্য কিছু করো।ইলিশ মাছ আমাকে একা রান্না করতে দাও।
-হেহে।আচ্ছা।
আজ সায়নীকে অনেকটা হাসিখুশি দেখে মুনিরারও বেশ ভালো লাগছে।তাকে দেখে মনেই হচ্ছেনা সে অসুস্থ ছিলো।
-কি ব্যাপার হঠাৎ এভাবে চলে এলে যে আফজালের রুম থেকে?
-তোমার ইচ্ছা হলে তুমি থাকো নাই কেনো?
-তোমার আবার কি হলো মুনিরার আম্মা?
-সেই কখন থেকে উনাদের বুঝাতে চাইছি পাবেলের সাথে সায়নীর বিয়েটা তাড়াতাড়ি দিয়ে দেওয়ার জন্য।তারা পাত্তাই দিচ্ছেনা আমার কথা।
-হাহা!এই ব্যাপার!
তাদের ছেলের ব্যাপার তারা বুঝবে,তুমি কেনো এমন করছো?
-সময় হলে বুঝবে কেনো করছি আমি।আপাতত চাইছি ওই মেয়ে এই বাড়ি থেকে দূর হোক।যতদিন সে থাকবে, শান্তি নাই আমার।
রাতের খাবার খেয়ে সকলে বসে গল্প করছে....
পাবেলের বাবারা চলে যেতে চাইলেও আফজাল খান যেতে দেয়নি।আর পাবেল যায়নি সায়নীর কথা রাখতে।
-সায়নী তুই এতো ভালো রান্না কি করে করিস বলতো!
ফুফুর কথায় মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে সায়নী বলে-
ভালো লেগেছে তোমার?
-শুধু ভালোনা।অনেক বেশি।
বিয়ের পরে তোকে কোনো কাজ করতে হবেনা।শুধু রান্নাটাই করবি।রান্না কিন্তু আর কাউকে করতে আমি দিবোনা।তুই কি বলিস পাবেল?
-আমি আর কি বলবো।
-কেনো তোর ভালো লাগেনি রান্না?
সায়নীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সে বলে-
লেগেছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে বড়রা যে যার রুমে চলে যায়।
আফরান খেয়াল করে সায়নীকে দূর্বল লাগছে আবার।
-সায়নী?
-হুম?
-ঘুমিয়ে পড়ো।তোমার শরীর ভালো নেই।
-না আমার উনার সাথে গল্প করতে ভালোই লাগছে।তুমি আর মুনিরা যাওনা ঘুমোতে।
আমরা গল্প করি।
আফরান কিছু বলার আগেই পাবেল বলে উঠে-
শরীর খারাপ মানে?সায়নী তুমি অসুস্থ?
-নাতো!
-আফরান যে বললো?
-ওহ আসলে কাল একটু খারাপ লেগেছে।
-তার মানে অসুস্থ।প্লিজ তুমি আর রাত জেগোনা।
-আপনার সাথে গল্প করতে ভালোই লাগছে আমার।
-উহু গল্প পরে করা যাবে।এখন ঘুমোতে হবে।
-কিন্তু..
-কোনো কিন্তু নয়।চলো আমি তোমায় রুমে দিয়ে আসি।
আফরানে এমনিতেই সায়নীর পাশে পাবেলকে সহ্য হচ্ছেনা তার উপর বেড রুমে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনে মাথাটা খারাপ হয়ে যায়।তবুও রাগ সংযত করে পাবেলের দিকে তাকিয়ে আফরান বলে উঠে-
না থাক।
-মানে?
-মানে আমি ওয়াশরুমে যাবো এমনিতেও।তো আমি ওকে দিয়ে আসি।তোমরা থাকো।এসে আবার গল্প করবো।
-ঠিক আছে।
সায়নীকে নিয়ে আফরান চলে যায় সায়নীর রুমে।
ভেতরে ঢুকে দরজাটা হালকা ঠেলে সায়নীকে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে জড়িয়ে ধরে সে।
-উফ ছাড়ো আফরান।
-নাহ।
-লজ্জা করেনা তোমার?
-আমার বউকে আমি জড়িয়ে ধরেছি।কেনো লজ্জা লাগবে শুনি?
-কালকের থাপ্পড় আমি ভূলিনি।
-তাই আমাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য পাবেলের সাথে নাটক করছো?কিন্তু লাভ হয়নি।জেলাস হয়নি আমি।
-দেখেছি আমি।
-কি দেখেছো?
-তোমার লাল লাল চোখ।
-হাহা।
আফরানের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে সায়নী বলে-
পাবেল কে সব জানাবো?
-তোমার ইচ্ছা।
-ঠিক আছে।মুনিরার বাবারা চলে গেলেই কিন্তু খালুকে সব বলবা।
-হুম হুম বলবো।তুমি চাইলে আমি এখনও বলতে পারি।আগেও বলেছি তোমাকে যখন বলতে বলো মুনিরার কথা বাবাকে বলতে পারবো আমি।
বলিনি?
-হুম।
-তবুও তুমি রাগ দেখাচ্ছো আমার সাথে।
-কি করবো!ঠিক রাখতে পারিনা নিজেকে।
-আর একটু ধৈর্য্য ধরো সব ঠিক হয়ে যাবে।
-হুম।ঠিক আছে যাও এখন।
-যাচ্ছি,আগে বলো কাল কোন গালে যেনো মেরেছি?
-সেটাকি ভূলবো!ডান গালে।
-এতো আদর মনে থাকেনা,এই একটা...আচ্ছা তুমি আমাকে মারো আজ।মেরে প্রতিশোধ নাও।
-হয়েছে ঢং অনেক।যাওতো কেউ দেখে ফেলবে।
আচমকা সায়নীর ডান গালে চুমু খেয়ে আফরান দৌড়ে তার রুম থেকে বের হয়ে যায়।
আফরানের এমন কাণ্ডে সব রাগ চলে যায় সায়নীর।
-কি বলেন আজ সায়নীর জন্মদিন!
-জ্বী হুম আজ জন্মদিন।
-ইশ আরেকটু আগে বললেতো ঠিক রাত ১২টাই উইশ করতে পারতাম।
আফরান ফিরে এসে দেখে পাবেল আর মুনিরা এখনও বসে গল্প করছে।তা দেখে সে বসতে বসতে বলে-
কি নিয়ে কথা হচ্ছে পাবেল?
-আজ নাকি সায়নীর জন্মদিন?
পাবেলের মুখে সায়নীর জন্মদিনের কথা শুনেই আফরানের মেজাজ খারাপ হওয়ার অবস্থা।কোনোমতে মাথা ঠাণ্ডা রেখে জিজ্ঞেস করে-
তোমাকে কে বলেছে?সায়নী?
-আরে না,মুনিরা।
মুনিরার দিকে তাকিয়ে আফরান প্রশ্ন করে-
তুমি কিভাবে জানো?
-বাবা সায়নী আপুর জন্য উপহার তৈরি করে রাখছিলেন।সেই সময় বাবার রুমে গিয়েছিলাম আমি।তার কাছ থেকেই শুনেছি।তাই ভাবলাম আপুর হবু বরকে বলি।উনি যেহেতু আছেন এখানে,আপুকে কোনো সারপ্রাইজ দিতে পারবেন।আপুতো সারপ্রাইজ অনেক পছন্দ করে শুনেছি।আপু সাথে সাথে ছিলো বলে এতোক্ষণ বলতে পারিনি।
-আরে সমস্যা নাই।আজ থেকে শুরু।পুরো দিন পরে আছে।এই আফরান ভাই আইডিয়া দাওনা কি করা যায়?আর তুমিতো ওকে আগে থেকেই চেনো।ওর কি পছন্দ তাও জানবে নিশ্চয়?
সায়নীর জন্য আগে থেকেই সারপ্রাইজ প্লান করে রেখেছিলো আফরান।কিন্তু মুনিরা আর পাবেলের জন্য সে একা তাকে সারপ্রাইজ দিতে পারবেনা ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে যায় তার।হতাশ হয়ে তার আইডিয়ার কথা পাবেলদের বলতে থাকে সে।
সকাল ৭টা...
এলার্ম বাজছে.....
কিন্তু সায়নীর যতদূর মনে আছে সে মোবাইলে এলার্ম দিয়ে ঘুমোয়নি।তাহলে কোথায় বাজছে!ঘুম ঘুম চোখে সে বিছানায় বসে পড়ে।চারদিক আলোকিত হয়ে আছে।কিন্তু বারান্দার দরজা কে খুলেছে আর জানালার পর্দাটা বা কে সরিয়েছে!
বিছানা থেকে একটু দূরে টেবিল-টার দিকে তাকাতেই দেখে একটি ছোট টেবিল ঘড়ি,যেটাতে এলার্ম বাজছে।এই ঘড়িটা এখানে কিভাবে আসলো সায়নীর মাথায় কাজ করছেনা।তবে আপাতত এটা বন্ধ করাই তার কাজ।
সায়নী ঘড়িটা নেওয়ার জন্য বসা থেকে উঠতেই অবাক হয়ে যায়।ভালো করে চারদিক তাকিয়ে দেখে তার রুমের দেওয়ালে রঙ-বেরঙের বেলুন লাগানো,ফ্লোরে ফুলের পাপড়ি ছিটানো।
টেবিলের পাশে গিয়ে ঘড়িটা হাতে নিয়ে এলার্ম বন্ধ করে সে।এই ঘড়িটা সে আগে দেখেনি এই বাড়িতে।লাভ শেইপ এর অনেক কিউট একটা ঘড়ি।
টেবিলের উপর একটা কার্ডও দেখতে পায় সে।
হাতে নিয়ে খুলতেই লেখা দেখে-
Happy Birthday Sayoni...
আফরান ছাড়া তার জন্য এসব আর কে করতে পারে!
তার মনে না থাকলেও আজকের দিনটা আফরান ঠিকই মনে রেখেছে ভেবে খুশিতে তার চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে।
সেই সময় হাত দিয়ে তার চোখ দুটো চেপে ধরে পাবেল।
সায়নী হাতের ছোঁয়া পেয়ে কিছু না ভেবেই বলে ফেলে-
তুমি আজকের দিনটা মনে রেখেছো আফরান!
সায়নীর মুখে আফরানের নাম শুনে চমকে যায় পাবেল।
তার সাথে চমকে যায় দরজার পাশে আফরানের সাথে দাঁড়ানো মুনিরা।
(চলবে)

Comments
Post a Comment