হৃদয়ের গহীনে - সাজি আফরোজ (পর্ব ৬)
-হ্যালো আসসালামু-আলাইকুম।
-জারিফ আমি পিয়ালী।
-জ্বী আপু বলেন?
-গাড়ি পেয়েছো?
-হুম।
-শুনো কিছু খেয়ে নিও দুজনে।আর হিয়ার খেয়াল রেখো।শক্তি নেই ওর একদম। গাড়ি থেকে নেমে হাত ধরে রাখবা।তোমার বড় বোনের মতো খেয়াল রাখবা।
-আচ্ছা আপু।
জারিফ এর বুঝতে বাকি রইলোনা এসব দিয়া শিখিয়ে দিয়েছে পিয়ালীকে।
সে না বললে যে খেয়াল রাখলেও দুরুত্ব বজায় রাখবে দিয়া জানতো।
জারিফের পাড়ার ভাবী রাত্রির সাথে জারিফের ছোট বেলা থেকে ভাব।জারিফকে ছোট ভাইয়ের মতই দেখে।একদিন দিয়া তাদের একসাথে রাস্তায় কথা বলতে দেখে।
-কোথায় যাচ্ছিলে তুমি উনার সাথে?
-কোথাও না।রাস্তায় দেখা হয়েছে।
-জারিফ আমি পিয়ালী।
-জ্বী আপু বলেন?
-গাড়ি পেয়েছো?
-হুম।
-শুনো কিছু খেয়ে নিও দুজনে।আর হিয়ার খেয়াল রেখো।শক্তি নেই ওর একদম। গাড়ি থেকে নেমে হাত ধরে রাখবা।তোমার বড় বোনের মতো খেয়াল রাখবা।
-আচ্ছা আপু।
জারিফ এর বুঝতে বাকি রইলোনা এসব দিয়া শিখিয়ে দিয়েছে পিয়ালীকে।
সে না বললে যে খেয়াল রাখলেও দুরুত্ব বজায় রাখবে দিয়া জানতো।
জারিফের পাড়ার ভাবী রাত্রির সাথে জারিফের ছোট বেলা থেকে ভাব।জারিফকে ছোট ভাইয়ের মতই দেখে।একদিন দিয়া তাদের একসাথে রাস্তায় কথা বলতে দেখে।
-কোথায় যাচ্ছিলে তুমি উনার সাথে?
-কোথাও না।রাস্তায় দেখা হয়েছে।
-বাহ এতো চিনো যে মুখ বন্ধের ভেতরেও চিনে ফেলেছো তাকে তুমি।
-আরে না।উনি ডাক দিয়েছে আমাকে।
আর এমন করছো কেন!উনি আমার বড় হয়।
আমাকে চিনে তাই ডাকতে পারে স্বাভাবিক।
-বড় হয়েছে কি হয়েছে!আর কতটুকু বড় হবে!
আজ এখন থেকে সব মেয়ের থেকেই দুরুত্ব বজায় রাখবা।
-মা-বোন থেকেও?
-মা-বোন থেকে না।তবে নিজের কাজিন থেকেও।সেটা বড় বা ছোট হোক।
-ঠিক আছে বাবা মনে থাকবে।
এসব মনে পড়তেই হাসি পায় জারিফের।
বাচ্চা-বাচ্চা কাণ্ডগুলো ৫মাস ধরে মিস করছে সে।
এদিকে পিয়ালী জহুরের বড় ভাইকে ফোন করে
-ভাইয়া প্লিজ হিয়ার জন্য অপেক্ষা করিয়েন।
-ওকে না পাঠালে ভালো হতো।গ্রামের মানুষদের মেন্টালেটি অন্য রকম।আমি তবুও চেষ্টা করবো।
ফোন রেখে পিয়ালী ভাবতে থাকে কি করে নিজের মন কে শান্তনা দিবে হিয়া!জহুর তাকে অনেক ভালোবাসতো।রিয়াদ এর মতো প্রতারক-কেও ভূলে থাকা কষ্টকর।সেখানে ভালোবাসার মানুষকে আদৌ ভূলে থাকা যাবে কি!
দিয়ার মন কিছুতেই শান্ত হচ্ছেনা।হিয়ার সাথে যেতে পারলে তার হয়তো এমন অস্থির লাগতোনা।এমন সময় ফুফু আসে তাদের রুমে-
ঘুম হলো তোদের?কটা বাজে খেয়াল আছে?
-জ্বী ফুফু হয়েছে।
-কিরে হিয়া কই?
-আপুতো বের হলো এইতো একটু আগে।দেখোনি?
-নাতো।আমাকে না বলে,না খেয়ে এতো সকালে কোথায় বের হলো?
-ওর বান্ধবীর কাছে ওর একটা বই আছে।বান্ধবী নাকি আজ গ্রামের বাড়িতে চলে যাবে ১০দিনের জন্য।তাই আপু ওটা নিতে গিয়েছে।চলে আসবে খুব তাড়াতাড়ি,এইতো বাসা কাছেই আছে।
-আহা খেয়ে যেতে পারতো।
-এসে ভাত খাবে।রান্না করে নাও।
অবশেষে হিয়ারা পৌছায় জহুরদের এলাকায়।
ইচ্ছে ছিলো বউ হয়ে আসবে সে এখানে,
কখনো ভাবেনি তার জহুরের লাশ দেখতে আসতে হবে।সারাজীবন একসাথে থাকার জন্য নয়,
শেষবারের মতো দেখার জন্য আসতে হবে!
.
সেদিন ভাগ্য তাদের সাথে ছিলোনা।
জহুরকে সে দেখতে পারেনি,দেখেছে তার কবর।
জহুরের কয়েকজন বন্ধু অপেক্ষা করছিলো হিয়ার জন্য।একজন হিয়ার কাছে গিয়ে বলে-
দুঃখিত আপু।জহুরের আব্বু হুজুর আপনিতো জানেন।বাইরের কাউকে তিনি লাশ দেখতে দেননি।তাছাড়া খুব তাড়াতাড়ি দাফন কার্য সম্পন্ন করা হয়।
হিয়ার চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে হচ্ছিলো,
"আমি কি বাইরের মানুষ!তোমরা আমার জন্য একটু অপেক্ষা করতে পারলেনা।জহুরের ইচ্ছাও রাখলেনা"।
হিয়া জহুরের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে অনবরত কাঁদতে থাকে।আশে পাশের মানুষের ভিড় জমে যাচ্ছিলো।তাই জারিফ হিয়াকে সরে যেতে বলে।সেই সময় হিয়া কবরের পাশ থেকে সরতে নারাজ ছিলো।তাই জারিফ একপ্রকার জোর করে,টেনে বের করে হিয়াকে।
সেই সময় হিয়ার অবস্থা দেখে জারিফও চোখের পানি আটকাতে পারেনি।মনে মনে ভাবছে, "ভালোই হলো লাশ দেখেনি,নিথর দেহটা দেখে আরো ভেঙে পড়তো হিয়া।"
সেই সময় তাকে ফোন দেয় পিয়ালী-
-জারিফ তোমরা কোথায়?
-কবর স্থান এর পাশেই।কবর দেওয়া হয়ে গিয়েছে,দেখতে পারেনি।
-ওহ।ওকে নিয়ে চলে আসো।
ওখানে থাকাটা ভালো হবেনা।
-ঠিক আছে।
বাসে বসে আছে হিয়া আর জারিফ।হিয়ার ইচ্ছা করছিলো নিজের চুল নিজে টেনে ছিঁড়ে ফেলতে।এতো অভাগী সে জহুরকে শেষ বারের মতো দেখতেও পারেনি।
জারিফ হিয়ার অবস্থা দেখে তাকে হাসানোর চেষ্টা করে।
দিয়াকে নিয়ে জারিফের বিভিন্ন হাসির ঘটনা বলতে থাকে।জারিফের কথার সাথে জহুরের কথার অনেকটাই মিল।
দিয়া প্রায় হিয়াকে বলতো- জারিফ আর জহুর ভাইয়ার স্বভাবের অনেক মিল আছে আপু।
আজ বুঝতে পারলো হিয়া আসলেই মিল রয়েছে।আর তাই তার ছোট বোনটাও প্রেমে পড়ে গিয়েছে।অবশ্য এই টাইপের ছেলে গুলোর প্রেমে না পড়ে উপায় নেই।
ভাবতেই মুখে হাসি ফুটে ওর।
আর তখনি জারিফ হিয়ার সাথে একটা সেলফি তুলে দিয়াকে পাঠায়।
এতক্ষণে দিয়া আর পিয়ালীর মুখেও হাসি ফুটে।তখনি ফুফু বলে উঠে-
বাহ এতক্ষণ পরে হাসি দেখলাম।এর আগেতো মনে হচ্ছিলো দুজনকে মারা হয়েছিলো।হাহা।
ফোন বেজে উঠে দিয়ার।দিয়ার মা ফোন দিয়েছে।
-হ্যালো দিয়া?
-আম্মু বলো?
-চলে আয়না।ভালো লাগছেনা।
-চলে আসবো কাল সকালেই।
-আচ্ছা হিয়া কোথায়?
-বান্ধবীর বাসায়।
-কোন বান্ধবী!?
-আহা সবাইকে চিনবে কথা নেই।চলে আসবে একটু পরেই।
-ঠিক আছে।
ফোন রাখতেই দেখে হিয়ার মায়ের ফোন এসেছে।পিয়ালীর কথায় ফোন রিসিভ করেনি।
কি বলবে সে চাচিকে!নিশ্চয় চিন্তায় আছে চাচি।তাই সে হিয়াকেই ফোন করে বলে মায়ের সাথে কথা বলতে।
-হ্যালো আম্মু?
-বান্দরবন এসেছিলি?
-হুম।
-কার সাথে?
-একা।
-তুইকি পাগল!আমাদের চিন্তা নেই তোর?
-করেছিলাম তো চিন্তা।সারাক্ষণ ছেলেটাকে চাকরী চাকরী করে বিরক্ত করেছি।কি হলো বলো!শেষ বারের মতো দেখতে গিয়েছি এটাও তোমাদের সমস্যা।একটা কাজ করো আমি যেনো মরে যাই সেই দোয়া করো।
-এভাবে বলেনা মা!আমি কি চেয়েছি এইরকম কিছু হোক?তোর ভালোর জন্য সময় দিয়েছিলাম,কিন্তু মেনেতো নিয়েছিলাম তোদের সম্পর্ক।
শক্ত হো,সাবধানে যা।
-রাখছি এখন।
হিয়া বুঝেছিলো তার মা-ও আজ কাঁদছে।
তার পরিবার অন্য পরিবারের মতো প্রেমের কথা জেনে তার গায়ে হাত তুলেনি,পড়া বন্ধ করায়নি।শুধু ভালো ছেলে আর ভালো চাকরী চেয়েছে।তবুও কেনো এতো রাগ হচ্ছে তার ওদের উপর!
দিয়ার ফোন বেজে উঠে।জারিফের ফোন এসেছে।
-কি ব্যাপার মনির কোনো খবর নাই কেন?
-এমনে।
-এমনে!হতেই পারেনা।কি হয়েছে বলো?
-আমিও তো যেতে পারতাম।তুমি আমাকে নিষেধ করেছো শুধু শুধুই।
-শুধু শুধু নয়।তোমাদের বাড়ি বান্দরবন শহরে।আর জহুর ভাইয়াদের অনেকটা ভেতরে।হিয়া আপু নিজেও চিনেনা।
উনাকে এভাবে সকালে নিতে নির্জন রাস্তা দিয়ে আমার নিজেরই ভয় লাগছিলো।যদিও বাসে মানুষ আছে তাও তারা অপরিচিত।সেখানে তুমি থাকলে আরো চিন্তায় থাকতাম আমি।তাছাড়া তুমিতো জার্নি করতে অভ্যস্ত না।বুঝাতে পেরেছি কি বলতে চাচ্ছি আমি?
-হুম।
-তোমার আপু কি শুরু করছে দেখো।
-কি?
-আরে খাবার এনেছি খাচ্ছেনা।উনি না খেলে আমি কি করে খাই বলতো?
-তুমি আগে খেয়ে নাও তারপর আপুকে জোর করে খায়িয়ে দাও।
-ঠিক আছে তাই করতে হবে দেখছি।তুমি খেয়েছো?
-হুম।
-আমরা চলে আসতেছি চিন্তা করোনা।
ফোন রেখে জারিফ হিয়াকে বলে...
-তাহলে আমি খেয়ে নিচ্ছি। আমি কিন্তু খিদা সহ্য করতে পারিনা।
-খাও বাবা।
-কিন্তু আপনাকেও খেয়ে নিতে হবে পরে।
-ঠিক আছে।
দিয়া ভাবতে থাকে প্রায় ৫মাস পর জারিফের সাথে তার ভালোভাবে কথা হচ্ছে।
কিন্তু একটু পর থেকে সেটাও হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে।সব আগের মতো হয়ে যাবে।
আচ্ছা সব কি ঠিক করা যায়না!
.
(চলবে)

Comments
Post a Comment