হৃদয়ের গহীনে - সাজি আফরোজ (পর্ব ১)
অনেকক্ষণ যাবৎ ফোনটা বেজেই চলেছে।হিয়া রেগে আছে তাই সে জহুর এর ফোন রিসিভ করছেনা।কিন্তু ফোন অনবরত বেজেই যাচ্ছে।আর থাকতে না পেরে রিসিভ করে হিয়া-
হ্যালো
-হিয়া কি হয়েছে তোর?
-কেনো তুই জানিসনা কি হয়েছে?
-না জানিনা।টানা ২দিন ফোন বন্ধ তোর।
কিছু না বলে এভাবে যোগাযোগ কেনো বন্ধ করেছিস?
-আমারতো আরো বড় কিছু করার উচিত ছিলো।
-কিন্তু কেনো?
-আবার কেনো!২দিন আগে আমার জন্মদিন গেলো।তুই আমাকে উইশ করলিনা জহুর।কি করে পারলি এটা!
-কিন্তু তুইতো ফোন অফ করে রেখেছিস।
-সেটাতো দিনে।তোর আমাকে রাত ১২টাই শুভেচ্ছা জানানোর উচিত ছিলোনা?
-আচ্চা তুই বল এইরকম আগে করেছি আমি?
-না।এখনতো আমি পুরান হয়ে গিয়েছি।তাই আর কি।
-দেখ মনি তুই আমাকে ভূল বুঝছিস।আমি চেয়েছিলাম এবার ঠিক ওই সময়েই তোকে শুভেচ্ছা জানাবো যেই সময়ে তুই এই পৃথিবীতে এসেছিলি।রফিক এর দোকানটা সাজিয়ে রেখেছিলাম তোর প্রিয় ফুল দিয়ে।কেক এর ব্যবস্থা করেছিলাম। চেয়েছিলাম সারপ্রাইজ দিবো।কিন্তু তুইতো....
-থাক আর মিথ্যে বলতে হবেনা।
-আচ্ছা বিশ্বাস না হলে ফেবুতে দেখ ইনবক্স এ।
Happy Birthday My Love Hiya লেখা একটি সুন্দর কেক,হিয়ার পছন্দের ফুল দিয়ে দোকানটা ডেকোরেশন।এসব দেখে পানি চলে আসলো হিয়ার চোখে।তাড়াতাড়ি করে জহুর কে ফোন দিলো।
-হ্যালো জহুর?
-কি বিশ্বাস হলো?
-দুঃখিত আমি।
-আরে ঠিক আছে।এখন থেকে কিচ্ছু করবোনা শুধু রাত ১২টাই উইশ করবো।
হাহাহা।বাদ দে।আজ বের হ।
-আমিতো শহরে চাচার বাসায় চলে এসেছি।মাত্র ঢুকলাম।রাগ ছিলাম তাই বলা হয়নি তোকে।
-আচ্ছা খুব তাড়াতাড়ি আমি যাবো তোর গিফট নিয়ে।
-কি??
-শাড়ি।তবে এই শাড়িটার সাথে কোমরে একটা চিকন চেইন(বিছা)পরলে সেই মানাবে তোকে।আমি অনেক খুঁজেছি।পাচ্ছিনা এখানে।
-আচ্ছা আমি কিনে নিবো ওটা।
হিয়ার কথা শুনছে দিয়া।হিয়ার চাচাতো বোন দিয়া।
দিয়া এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী।
দিয়াদের নিজ বাড়ি বান্দরবন।
চার চাচা,দুই ফুফু তাদের।
সরকারী চাকরী করেন দিয়ার বাবা।তার কর্মস্থান চট্রগ্রাম শহরে।তাই তিনি দিয়াদের সাথে নিয়ে শহরে চলে আসেন।সেই থেকে বাবার চাকরীর সুবাদে ছোট থেকেই দিয়াদের চট্রগ্রাম শহরে থাকতে হয়।
আর হিয়া অনার্স ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী।উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর উচ্চশিক্ষার জন্য চট্রগ্রাম শহরে আসে সে।দিয়াদের বাসায় থাকে সে।
প্রেম ভালোবাসা না বোঝার আগে থেকেই হিয়া আর জহুর এর প্রেম দেখে আসছে দিয়া।
হিয়ারা যখন দিয়াদের বাসায় বেড়াতো আসতো,
দিয়ারা যখন হিয়াদের বাসায় বেড়াতো যেতো তখন দিয়া
দেখতো এই প্রেম নামক বিষয়টা কত প্যারা।
সমবয়সী হিয়া আর জহুর।একই শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলো তারা।
বেচারী হিয়াকে লুকিয়ে ফোনে কথা বলতে হতো।লুকিয়ে দেখা করতে হতো।
হিয়ার মুখে শুনেছে হিয়ার আব্বু ইট দিয়ে কতো ফোন ভেঙেছে হিয়ার তাও সে নতুন ফোন আনতো জহুর থেকে।
গ্রামের বাড়িতে এসব প্রেম ভালোবাসা একপ্রকার হারাম ধরা হয়,তার উপর হিয়াদের ভরা ভারী।
একবারতো চাচির কাছে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিলো তারা।জহুর হিয়াদের বাড়ির পেছনের বিল এ গিয়ে হিয়ার সাথে দেখা করে।ফেরার পথে জহুর কে হিয়ার চাচী দেখে ফেলে।সে কি চিৎকার চেঁচামেচি করে হিয়ার চাচী!চিৎকার করে বলেন,এই ছেলে কোনো মেয়ের সাথে দাঁড়িয়ে ছিলো।কিন্তু কোন মেয়ে তা দেখেনি তিনি।হিয়ার চাচীর চিৎকারে হিয়ার চাচাতো ভাই চলে আসে।জহুর কে তাড়া করে সে।জহুর এর বাইক ছিলো বলে সেবার বেঁচে গিয়েছিলো সে,সাথে হিয়াও।
একই শ্রেণীর বলে হিয়া উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পরে নিজের পড়াশোনার ক্ষতি করে ১বছর ভর্তি না হয়ে বাসায় বসে থাকে।পরের বছর চট্রগ্রাম এসে শহরের কলেজে ভর্তি হয়েও ক্লাস করেনি সে। যাতে জহুর তার চেয়ে কিছুটা এগিয়ে যেতে পারে,তাদের আর কেউ সমবয়সী না বলে।তার জন্য ২টা বছর নষ্ট করেছে সে।
এসব শুনে ঠিক করেছিলো দিয়া জীবনে সে প্রেম করবেনা।হিয়াকেও বলেছে সে।সেদিন হিয়া হেসে বলেছিলো," আরো বেশি করবি তুই।কখন কাকে ভালো লেগে যাবে বুঝবিও না"।
হুম আসলেই বুঝতে পারেনি দিয়া কিভাবে সেও প্রেমে পড়ে গেলো।
তখন সে সপ্তম শ্রেণীর ছাত্রী।শীতকালের সময় ছিলো।হিয়া বেড়াতে এসেছিলো দিয়াদের বাসায়।হিয়াদের বড় চাচাতো বোন মিনুও এসেছিলো হিয়ার সাথে।মিনু তাদের নিয়ে একটি পার্কে ঘুরতে যায়।৩বোন অনেক মজা করেছিল সেদিন।ফেরার পথে কয়েকজন ছেলে তাদের পিছু নেয়।মিনু ছিলো একটু দুষ্টু স্বভাবের।সে ছেলেগুলোর কাছে নিজে গিয়েই বলে-
কি আমাকে পছন্দ হয়েছে কারো?
তাদের মাঝে একজন বলে-আপনাকে নয়।
মিনু ভাবে যেহেতু তাকে নয় তাহলে নিশ্চয় হিয়াকে।তাই বলে...
-আরে আমি হলেতো তাও হতো।কিন্তু ওই আপুরতো বফ আছে।
-আসলে উনাকেও নয়।ওই যে পিচ্চিটার ফোন নাম্বার হবেকি?
কথাটা শুনে মিনু আর হিয়া হা হয়ে যায়।
তাদের মাথায় দিয়ার চিন্তা আসেওনি।কারণ সে ছিলো ছোট।
তাই হিয়া বলে উঠে...
-এইটুকু মেয়ের কি নাম্বার আছে বলে মনেহয় তোমার!
আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে দিয়াকে নিয়ে তারা চলে যায়।
-কিরে দিয়া কি ভাবছিস?
-অবশেষে কথা বলা শেষ তোমার?
-হুম।
-তা বিয়ে কখন খাবো?
-আম্মু ৬ মাস সময় দিয়েছে।আর চার মাস আছে।এই সময়ের ভেতর ভালো চাকরী পেতেই হবে জহুরের।
তবে এখন ও আপাতত ছোট-খাটো চাকরী করছে একটা।
-ইনশাআল্লাহ্ ভালো ও করবে সামনে।
-হুম দোয়া কর।আচ্ছা আমি ফ্রেশ হয়ে আসি।
বাসায় আসার পর থেকেই জহুরের ফোন এর জন্য সুযোগ পাইনি।
-আচ্ছা আসো।
আবারো ভাবনার জগতে চলে যায় দিয়া।
পার্ক এর ঘটনার ৬মাস পরে স্কুল থেকে আসার পথে কারো ডাক শুনে দিয়া।পেছনে তাকাতেই চোখ বড় হয়ে যায় তার।এইতো সেই পার্ক এর ছেলেটা।এখানে কি করে এলো!
-এইযে ম্যাডাম।আপনি এখানে??
কিছু না বলে সোজা হেটে চলে যায় দিয়া।ভয় পেয়ে যায় যে।মনে মনে ভাবে নিজে ফোলো করে সে এখানে কেনো জানতে চায়!
আবার ডাক শুনতে পায় সে।
-আরে আরে দাঁড়াও।
-কি কি অসুবিধা?
-এ বাবা তুমি তোতলাও?
-কই নাতো।
-আমি তোমাকে দাঁড়াতে বলেছি কারণ তুমি সেদিনের মেয়েটি নাকি সিউর হওয়ার জন্য।
-হয়ে গিয়েছেন?এবার যাই আমি।
ওইদিন ছেলেটা ফলো করে দিয়ার বাসাও চিনে নেয়।
পরেরদিন দিয়া স্কুলের মাঠে যা দেখে তা দেখে সে পুরাই অবাক......
.
.
দিয়া যে স্কুলের শিক্ষার্থী সেটি স্কুল এন্ড কলেজ ছিলো।সেই কলেজের পোশাকে মাঠে দাঁড়িয়ে আছে সেই ছেলেটি।
দিয়ার বান্ধবী দেখে বলে-
এটা জারিফ ভাইয়া।
-তুই কেমনে জানিস?
-ক্রাশ খেয়েছিলাম অনেক আগেই।জেনে নিয়েছিলাম নাম।তুইতো আর আমাদের সাথে সবসময় ঘুরিস না।কেমনে জানবি!
-জারিফ!বাহ সুন্দর নামটা।
-ভালো লেগেছে?
-আরে না।
-তাহলে তাকিয়ে আছিস যে?
চিনিস?
-তোকে পার্কের ঘটনাটা বলেছিলাম না?এই সেই ছেলেটি।
-কি বলিস!
-হুম।
-ভাগ্যিস নীলয়ের সাথে সম্পর্ক-টা ছিলো নাহলে জারিফ ভাইকে প্রপোজ করে দিতাম।পরে উনি আমাকে তোর জন্য ফিরিয়ে দিলে লজ্জা পেতাম।
-হাহাহা।তুই-না অনেক ফাযিল।
দিয়ার বান্ধবী জুহি।চঞ্চল একটা মেয়ে।স্বভাবে দিয়ার উল্টো হলেও বেষ্ট ফ্রেন্ড ছিলো তারা।
এভাবে প্রায়ই দেখা হতো দিয়া আর সেই ছেলেটির।কিন্তু ছেলেটি কিছু বলতোনা।দিয়ার কেনো যেন ইচ্ছে হতো তার সাথে কথা বলতে।লম্বা,ফর্সা,স্মার্ট এমন একটা ছেলেকে দিয়ার বয়সী যেকোনো মেয়ের ভালো লাগার কথা।
একদিন দিয়া মাথা ব্যাথা করায় টিফিন টাইম এ ছুটি নিয়ে বাসায় একা ফিরছিলো।
পেছন থেকে বাইক নিয়ে একটি ছেলে তার সামনে এসেই হুট করে তার নাম জানতে যায়।দিয়া কিছু না বলে হেটে চলে যায়।
কিন্তু ঘটনা এখানেই শেষ নয়।
রোজ সে দিয়ার পিছু নেয়।
আরো কিছুদিন পর ক্লাসে দিয়ার কাছে ওদের ক্লাসের-ই একটি মেয়ে আসে।
-দিয়া?
-হুম শান্তি বলো?
-আশিক ভাইয়া তোমাকে পছন্দ করে।
-কে?
-যে বাইক নিয়ে ঘুরে তোমার পেছনে।আমি ওর খালাতো বোন।
-ওহ ভালোই হল তোমায় পেয়েছি।প্লিজ বলে দিও তোমার ভাইকে এসব না করতে।
-একটা চিঠি দিয়েছে।এটাতো নাও?
-সম্ভব না।আমার উনাকে ভালো লাগেনা জানিয়ে দিও।
দিয়া জানতোনা কি ভূল সে করেছে।আশিকের চিঠি ফিরিয়ে দিয়ে যে তার বিপদ বেড়েছে জানা ছিলোনা।
দিন দিন আশিকের অত্যাচার বাড়তে থাকে।
বাইক নিয়ে দিয়াকে রাস্তায় আটকানো,কথা বলতে চাওয়া,ওর বন্ধুরা দিয়াকে ভাবী বলে ডাকা,নানাভাবে বিরক্ত করতো সে।
একসময় অসহ্য হয়ে দিয়া আশিকের সাথে কথা বলতে যায়।
-দেখুন আমি আপনাকে ভালোবাসা দূরে থাক পছন্দও করিনা।
-আস্তে আস্তে সব হবে সম্পর্ক শুরু হলে।তুমি রাজি থাকো না থাকো তুমিতো আমার ধরেই রাখো।
-সম্ভব নয়।
-হাহা।কেনো শুনি?
-আমার বফ আছে।ওর কি হবে!?
-মিথ্যা বলবানা একদম।
-মিথ্যা নয়।
-তাহলে তোমার বফ এর সাথে পরিচয় করিয়ে দাও।তাহলে আর ডিস্টার্ব করবোনা তোমাকে।
-সত্যিতো?
-হুম একদম।
মিথ্যে বলেছিলো দিয়া।এখন এই বফ কই পাবে সে!
সেই সময় জুহি বলে উঠে-
লম্বু ভাইটা আছেনা!উনার সাথে প্রেম কর।
-কে?
-জারিফ ভাইয়া।
-ধ্যাত।
-তাহলে বাসায় বল।
-তুইতো জানিস আম্মু কেমন।চিন্তা করবে অযথা।আর যদি স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়!
-তাহলে জারিফ ভাইয়াকে বল তোকে সাহায্য করতে বফ সেজে।
-সে আমায় হেল্প করবে কেনো?
-যেহেতু তোর পেছনে ঘুরেছে সে তোকে পছন্দ করে।
-এখনতো ঘুরেনা।
-তাতে কি!ঘুরেছেতো।
-হুম কিন্তু কিভাবে বলব?
-ফ্রেন্ডশীপ করবি তার সাথে,তারপর হেল্প চাইবি।
-এতোবড় ছেলে ফ্রেন্ড!
-আরে হয় এইরকম।
-আমি পারবোনা।
-পারবি পারবি।
জুহি,জারিফ এর কাছে গিয়ে বলে-এইযে ভাইয়া?
-জ্বী?
-আপনি যে দিয়ার পেছনে ঘুরেছেন সে আপনার সাথে ফ্রেন্ডশিপ করতে চায়।
-কোন দিয়া?
-হায়হায় কার পেছনে ঘুরেছেন তাও জানেন না!ওইযে দূরে দাঁড়িয়ে আছে সেই দিয়া।
চমকে যায় জারিফ।মেয়েটিকে ভালো লাগলেও ছোট বলে আর পেছনে লাগেনি মেয়েটির।এখন দেখছে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!
তাড়াতাড়ি জবাব দেয়-
করবো।
..
(চলবে)
(চলবে)

Comments
Post a Comment