শেষ থেকে শুরু - সাজি আফরোজ (পর্ব ৪)


ঘড়িতে সময় রাত ১টা হলেও চোখে ঘুম নেই শাম্মির। মি.ফিরোজের কোনো সাড়া সে পায়নি। তার উপর সাব্বিরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন তার। সব মিলিয়ে মনটা একদমই ঠিক নেই শাম্মির।
বারান্দা থেকে বেরিয়ে এসে চেয়ার টেনে বসলো শাম্মি। টেবিলের উপর রাখা মোবাইলটা হাতে নিয়ে মেসেঞ্জার চালু করতেই ফিরোজের রিপ্লাই পেলো সে-
কি কথা?
.
ফিরোজের রিপ্লাই দেখে খুশিতে আত্নহারা হয়ে গেলো শাম্মি।
কাঁপাকাঁপা হাতে টাইপ করে সেন্ড করে দিলো-
কাল কি দেখা করতে পারি? বেশি সময় নিবোনা। ৫মিনিট?
.
অনলাইনেই ছিলো ফিরোজ। শাম্মির মেসেজ আসতেই সাথে সাথে সিন করলো সে। কিন্তু শাম্মির মেসেজটা তাকে ভাবাচ্ছে। কেনো শাম্মি তার সাথে দেখা করতে চাইছে? এলি কি এই বিষয়ে জানে কিছু?
নিজেরমনে প্রশ্নগুলো করে ফিরোজ রিপ্লাই দিলো-
কোথায়, কখন দেখা করবো বলে দিও।
.
.
.
চার হাতপা চারদিকে ছড়িয়ে বিছানার মাঝবরাবর শুয়ে রয়েছে ফিরোজ। যদিও এই অসময়ে এভাবে শুয়ে না থেকে ঘুমানোর কথা তার। কিন্তু ঘুম তার চোখে একেবারেই নেই। কপালে চিন্তার রেখা ফুটিয়ে ভাবতে লাগলো সে শাম্মিকে নিয়ে। কি বলতে চাইছে এলির মেয়ে তাকে?
.
.
.
-আজ কি তোর ক্লাস আছে শাম্মি?
.
তাড়াহুড়ো করে মি.ফিরোজের সাথে দেখা করার জন্য বেরিয়ে যাচ্ছিলো শাম্মি। মি.ফিরোজকে সকাল ১০টাই কফি শপে আসতে বলে নিজেই ঘুম থেকে দেরি করে উঠেছে। রাতে ঘুম হয়নি তার, সকালে কখন যে চোখটা লেগে গিয়েছে বুঝতেই পারেনি শাম্মি। ভাগ্যিস শাকিলের চেঁচামেচিতে ঘুমটা ভেঙ্গেছে তার!
১০টা বাজতে আর মাত্র ১৫মিনিট বাকি। তার উপর মায়ের ডাক! কি বলবে মাকে এখন?
.
-এই শাম্মি?
.
মায়ের ডাকে পেছনে ফিরে শাম্মি বললো-
ক্লাস আজ নেই। তবে একটা এসাইনমেন্ট আছে যেটা কালই জমা দিতে হবে। আর এটা আমরা বান্ধবীরা সবাই আজ একসাথেই কমপ্লিট করবো।
-তাই বলে কিছু না খেয়েই চলে যাবি?
-যাচ্ছিতো কফি শপেই। ওখানেই খেয়ে নিবো।
-কিন্তু....
-ওহ হো মা! আমি কি আর ছোট আছি নাকি? গেলাম।
.
এই প্রথম মিথ্যে বলে স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললো শাম্মি। সে যা করতে চলেছে তা জানলে কিছুতেই এলি এই পথে আগাতে দিবেনা তাকে। তাই তার কিছু না জানায় ভালো আপাতত।
.
.
.
-মা ভালো আছেন তোমার?
.
ফিরোজের করা প্রশ্নে জবাব দিলো শাম্মি-
জ্বী।
-শাকিল?
-জ্বী।
.
হালকা কেশে ফিরোজ বললো-
আর বাবা?
.
বাবার কথা শুনতেই ছলছল করে উঠলো শাম্মির চোখ। কোনোমতে নিজেকে সামলিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে সে বললো-
বাবা সেই কবে আমাদের ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ১০বছর হতে চললো!
.
শাম্মির কথা শুনে হতবাক হয়ে গেলো ফিরোজ। ১০বছর আগেই শাম্মির বাবা মারা গিয়েছে! আর সে এই খবর জানেও না! এলির উপর দিয়ে এই ১০বছরে কি ঝড়টাই না বয়ে গিয়েছে ভাবতেই বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো তার।
শান্ত গলায় শাম্মিকে জিজ্ঞাসা করলো সে-
এলি কি বিয়ে করেছে আর?
-নাহ। সকলে অনেক অনুরোধ করেছিলো। নানা ভাইতো উঠে পড়ে লেগেছিলেন মায়ের বিয়ের জন্য কিন্তু মা করেনি। কেনো জানেন?
-কেনো?
-আপনাকে ভালোবাসে বলে।
.
শাম্মির কথা শুনে নির্বাক হয়ে গেলো ফিরোজ।
ফিরোজের কাছে কোনো সাড়া না পেয়ে শাম্মি বললো-
কোন পরিস্থিতির মাঝে পড়ে মা অন্য একজনকে বিয়ে করেছিলো আপনার অজানা নয়। কিন্তু মা তার বিবাহিত জীবনে স্বাভাবিক হতে পারেনি। সেটা কাউকে বুঝতে দিতেন না তিনি। ধীরেধীরে আমি যখন বড় হতে থাকি মায়ের বুকে জমানো কোনো কষ্ট আছে তা বুঝতে পারতাম। তারপর যখন বাবা ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, সবাই মাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য জোর করেন। তখনি জানতে পারলাম কেনো মা আরেকটা বিয়ে করতে নারাজ। প্রথম বিয়েটা ছিলো অসহায়ত্ব কিন্তু দ্বিতীয়বার কোনো ভুল মা করতে চায়নি। সেদিন মায়ের কাছে আপনার সম্পর্কে জেনেছি। স্বীকার না করলেও বুঝেছি মায়ের মনে আপনি আছেন।
.
শাম্মির কথা চুপচাপ শুনে যাচ্ছে ফিরোজ। বারেবারে তার মনজুড়ে প্রশান্তির শীতল এক স্রোত বয়ে যাচ্ছে। এলি তার কথা ভেবেই ১০বছর একা থেকেছে! এলির মনে এখনো তার জন্য জায়গা রয়েছে! তার মানে এলি তাকে ভালোবাসে। আগের মতই ভালোবাসে!
ভাবতেই মুখে হাসির রেখা ফুটলো ফিরোজের মুখে। শাম্মির উদ্দেশ্যে বললো সে-
এসব জানানোর জন্য ধন্যবাদ তোমাকে।
-আমিতো এসব জানাতে আসিনি। একটা আবদার নিয়ে এসেছি।
-কি?
-আমার মাকে বিয়ে করবেন আপনি? প্লিজ?
.
আচমকা শাম্মির মুখে এমন একটা কথা শুনে চমকে গেলো ফিরোজ। আমতাআমতা করে সে বললো-
বুঝলাম না?
-মা আপনাকে ভালোবাসে আর আপনি মাকে। আপনাদের মাঝে তৃতীয় কোনো ব্যক্তিও নেই এখন। তবে কেনো আপনারা একে অপরের কাছ থেকে দূরে থাকবেন?
-আমিতো তোমাকে বলিনি এলিকে আমি এখনো ভালোবাসি?
-শপিং মলেই বুঝেছিলাম আমি আপনি মাকে ভালোবাসেন।
-কি করে?
-আপনি বলেছিলেন আপনি এখনো বিয়ে করেননি।
.
শাম্মির কথা শুনে হেসে উঠলো ফিরোজ। সেই হাসি মাখা মুখের দিকে তাকিয়ে শাম্মি বললো-
মা আপনাকে এখনো ভালোবাসে শুনে কিন্তু আপনার মুখে আলাদা একটা খুশির আবরণ আমি দেখতে পাচ্ছি। এর দ্বারা বুঝা যায়না কি, আপনি মাকে ভালোবাসেন?
-হু বাসি। এলির জন্যই বিয়েটা করা হয়ে উঠেনি।
-আজ কোনো বাধা নেই। মা জীবনে অনেক দুঃখ পেয়েছে। তাকে একটু সুখী দেখতে চাই আমি।
আপনি কি সাহায্য করবেন না?
.
ফিরোজ কিছু বলার আগেই ফোন বেজে উঠলো তার। পকেট থেকে ফোন বের করে স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো মায়ের ফোন। রিসিভ করতেই ওপার থেকে বললো তার মা-
মিনুদের বাসায় রওনা হতে হবে। তুই কোথায়?
-আছি কাছেই।
-তাড়াতাড়ি বাসায় আয়। রিং পরাতে হবে তো মিনুকে।
-হুম আসছি।
.
মিনুর কথা ভুলেই গিয়েছিলো ফিরোজ। মিনু মেয়েটা এতোদিন পর বিয়ে করতে রাজি হয়েছে। আর সে কিনা তার মনটা ভেঙ্গে দিবে? এটা কি ঠিক হবে?
.
-কি ভাবছেন?
.
শাম্মির ডাকে চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে এসে ফিরোজ বললো-
আমার মা বিয়ে ঠিক করেছেন আমার। আজ আমাদের বিয়ের পাকা কথা বলার দিন। মেয়েটাকে কি ঠকানো হবেনা?
-মোটেও না। আপনি যদি মনে একজনকে রেখে তাকে বিয়ে করেন বরং এটাই হবে তাকে ঠকানো।
.
চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো ফিরোজ। শান্ত গলায় বললো-
তুমি যা বলছো তা এলি মেনে নিবেনা শাম্মি। আমি এলিকে চিনি। এতোদিন পর এসব সে মেনে নিবেনা। মাঝপথে আবারো আমার মায়ের আশাটা পূরণ হবেনা, মিনু কেও কষ্ট দেওয়া হবে।
-আপনি আমার কথাটা শুনুন?
-আমি আসছি।
.
ফিরোজ চলে যাচ্ছে। শাম্মি ছলছল নয়নে তাকিয়ে আছে তার পথের দিকে।
শাম্মি কি তাহলে ভুল ভেবেছিলো? ফিরোজের মনে কি এলির জন্য জায়গা নেই? যদি থাকতো, তবে কি এভাবে মুখ ঘুরিয়ে নিতো পারতো সে!
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)