হৃদয়ের গহীনে - সাজি আফরোজ (পর্ব ৩)


-এই দিয়া সন্ধ্যা হয়ে গেলো আরো কতো ঘুমোবি তুই?
-আর একটু আপু।
-না উঠ বলছি।
-উহু তুমি না একদম...
-কি?আমি কিরে?
-কিছুনা।যাওনা ভাইয়ার সাথে কথা বলো।
-আরে ওতো ব্যস্ত এখন।তাই তোর সাথে বলবো।চল কোথাও ঘুরতে যাই।আমার ভালো লাগছেনা কিছু।
-হুম।

-কি হুম!কোথায় যাওয়া যায় বল?
-ফুফির বাসায়?অনেকদিন পিয়ালী আপুর সাথে দেখা হয়না।আপু নাকি এখন বাসায় আছে।
-ঠিক আছে।তাহলে কাল যাবো।
-আচ্ছা তুমি আপুকে জানিয়ে দাও।
পিয়ালী,দিয়াদের ফুফাতো বোন।বয়সে সবার বড় হলেও দিয়াদের সাথে ভালো সম্পর্ক তার।
পিয়ালী তাদের সবার চেয়ে আলাদা।নিজে স্বাধীন মতো চলতেই বেশি পছন্দ করে।চার ভাইয়ের একমাত্র বোন হওয়াতে আদরও বেশি পেয়েছে।সে এক জামা কোনো অনুষ্টানে দুবার পরেনা।এক মোবাইল দু'মাসের বেশি ব্যবহার করেনা।বলতে গেলে সবদিক থেকেই দিয়াদের চেয়ে আলাদা সে।মডার্ন একটা মেয়ে।তবে একটা দিকে তাদের মিল রয়েছে।তা হলো তারা সবাই ভালোবাসার প্রতি দূর্বল।হুম পিয়ালী ও তার ভালোবাসার মানুষের কাছে দূর্বল ছিলো।কিন্তু সেই দূর্বলতার সুযোগ নিয়েছে তার-ই ভালোবাসার মানুষ।
বাবার বন্ধুর ছেলে রিয়াদ এর সাথে প্রেমের সম্পর্ক হয়েছিলো তার।
শুরু থেকে সবটা ঠিক থাকলেও মাঝপথে সব এলোমেলো হয়ে যায়।
পিয়ালীর স্বপ্ন ছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হবে সে।তাই সে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য পড়াশোনায় খুব ব্যস্ত হয়ে যায়।
রিয়াদকেও তেমন একটা সময় দিতে পারতোনা সে।রিয়াদ তা মানতে নারাজ ছিলো।রিয়াদ তার পড়ার,কোচিং করার সময়টুকু তাকে দিতে চায়তোনা।সবসময় মানসিক চাপে রাখতো সে পিয়ালীকে।এসব এর জন্য পিয়ালীর পড়াশোনারর ক্ষতি হয় যার কারণে তার স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
সেদিন রিয়াদ তাকে শান্তনা না দিয়ে বিদ্রুপ করেছে তার উপর।তখন তাদের মাঝে খুব তর্ক হয়।এক পর্যায়ে রিয়াদ বলে ফেলে সে চায়না পিয়ালী তার চেয়েও ভালো কোথাও পোড়াশোনা করুক।এই কথাটিতে পিয়ালী জেদ করে আবার চেষ্টা করে।রাত-দিন পরিশ্রম করে সে।অবশেষে ২য় বার পরীক্ষা দিয়ে সে সফল হয়।
তার পরিশ্রমে সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হওয়ার সুযোগ পেলেও হারায় রিয়াদকে।
সেইদিনের তর্কের পরে সব ঠিক হয়ে গেলেও পিয়ালী সময় কম দিয়েছিলো রিয়াদকে।
আর সেই সময়টাই রিয়াদ অন্য কারো প্রেমে পড়ে যায়।আর তখনি তাদের সম্পর্কের ইতি হয়।
পিয়ালী এখনো বুঝতে পারেনা কিভাবে একটা মানুষ ৮বছরের সম্পর্ক এতো তাড়াতাড়ি ভূলে যেতে পারে একটু কথা কম হলেই।আদৌ কি এটা কখনো ভালোবাসা ছিলো!
রাত ১০টা ২বোন ছাদে বসে গল্প করছে।
-আপু তোমার হাতের রিং-টা অনেক সুন্দর।
-তোর ভাইয়া দিয়েছে।১০ আঙুলের জন্য ১০টা।
-হাহা।
-আমার সোনার গহনা পড়তে ভালো লাগেনা,পাথরের ভালো লাগে।তাই তোর ভাইয়া বলেছে বিয়ের দিন গোলাপি গাউনের সাথে ডায়মন্ড এর সেট দিয়ে সাজাবে আমাকে।
বিয়ের পরে দুটো চিকন চুড়ি,একটা ছোট নাকফুল,গলায় চিকন একটা চেইন,কানে ছোট ছোট কানের দুল পরে সবসময় হালকা সেজে থাকতে বলেছে।
-ওয়াও।কবে যে আসবে তোমার বিয়ে!
-মাত্র চার মাস।
-জানোতো শুধু নিজে সাজলে হয়না।বিয়ের দিন বোন কেও কিছু দিতে হয়।
-হাহা।তুইতো আমাকে হেল্প করেছিস অনেক সেই হিসেবে পেতেই পারিস।
-আচ্ছা শুধু এই জন্য?লাগবেনা যাও।
-আরে আমিতো মজা করলাম।বল তোর কি চায়?
-দুলাভাইকে বলবো তোমাদের বিয়ের সময়।
-আচ্ছা বাবা ঠিক আছে। তোর কেমন ইচ্ছে বিয়েতে সাজার?
-আমার দেরী আছে।
-কিন্তু ইচ্ছাতো থাকে সব মেয়ের।বলনা শুনি।
-আমার ইচ্ছে ছিলো গোলাপি লেহেঙ্গা পরবো।কিন্তু জারিফ সবসময় বলতো আমাকে লাল রঙ এ বেশি মানায়।আমার নাকি ওর সাথে বিয়া না হলেও আমার বিয়ের দিন একটা লাল শাড়ি গিফট করবে।এই কথাটা শোনার পর থেকে ইচ্ছে-টাও বদলে গেলো।লাল লেহেঙ্গা পরে বিয়ে করবো এটাই পাক্কা।আর জানো ও কি বলেছে?
-কি?
-গায়েহলুদের দিন ও নাকি আমাকে লুকিয়ে দেখতে আসবে।আমি বলেছি লুকিয়ে আসতে হবেনা।এমনেই আসিও।নাচবো একসাথে।
-হাহা।তোদের সাথে আমরাও নাচবো।
জহুরের ফোন এসেছে আবার।
-হ্যালো মনি কি করো?
-গল্প করছিলাম দিয়ার সাথে।
-আহা আমি ডিস্টার্ব করে দিলাম।
-হুম তাতো করেছো।
-একটু করি।রাতে কইরো গল্প ওর সাথে।
-আচ্ছা।খেয়েছো?
-না খাবো একটু পরে তারপর ঘুমোবো।তোমরা খেয়েছো?
-হুম।
-দিয়া ভালো আছে?
-আছে।
-চাচা-চাচী?
-আছে।
-দিয়ার ছোট ভাইরা?
-আরে সবাই ভালো আছে।
-আচ্ছা।
-আমি আর দিয়া কাল পিয়ালী আপুদের বাসায় যাবো।
-আচ্ছা ঠিক আছে।সাবধানে যেও।
ছাদের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে দিয়া।আকাশের তারা গুনার বৃথা চেষ্টা করে চলেছে।৫মাস কি খুব বেশি সময়!মনে হচ্ছে হাজার বছর ধরে তার মনটা অশান্ত।
কেনো!
জারিফের জন্য!
কিন্তু সেতো ভালো থাকার জন্যই জারিফের থেকে দূরে সরে এসেছে।তবুও কেনো সে ভালো থাকতে পারছেনা!
-দিয়া?
-হুম আপু।
-উপরে কি তাকিয়ে দেখছিস?
-চাঁদ,তারা।ইচ্ছা ছিলো কোনো এক সময় জারিফের সাথে দাঁড়িয়ে দেখবো,চাঁদনী রাতে গল্প করবো।
-জারিফের সাথে সব ঠিক করে নে।দুজনেই কষ্ট পাচ্ছিস।
-ও পাচ্ছেনা।আমাকে বলেছে সায়মার সাথে কথা হয় ওর।খুব তাড়াতাড়ি ওদের সম্পর্ক হতে পারে,তখন যেনো আমি পথের কাটা না হই।
-কে সায়মা?
-জারিফের কাজিনের বিয়েতে পরিচয় হয়েছে।বর পক্ষের কেউ হবে আর কি।ওখানে কথা হয়েছে তারপর নাম্বার নিয়েছে।
-এরপর?
-এরপর আর কি!চুটিয়ে কথা চলছে।
-চুটিয়ে প্রেমতো চলছেনা?
-চলবে সামনে।
-হাহাহা।
-হাসছো যে?
-আরে জহুর-ও এমন করেছিলো একটা মেয়েকে নিয়ে।পরে আমি যে কান্না.....
-আমার কান্না আসেনা সহজে।
-আরে এগুলা জেলাস দেখানোর জন্য করে এইরকম।কিন্তু মনে থাকে এক জন-ই।নাহলে কি তোকে ফোন দিতো?ও না বললেও তুই জানতে পারতিনা।
-আমি যদি আবার ফিরে যায়।ওদের মাঝে ঝামেলা হবে।তাই আগে থেকেই বলে দিয়েছে।
-কি জানি বাপু তোদের কি সমস্যা।আয় চল ঘুমাবো।কাল পিয়ালী আপুদের ওখানে যেতে হবে।৩জন এক সাথে হলেতো ঘুম হয়না আমাদের।
তাই আজ ঘুমিয়ে নেওয়া ভালো হবে।
-হেহে ঠিক আছে চলো।
শুয়ে পড়েছে দু'বোন।দিয়ার দিকে তাকিয়ে বেশ বুঝতে পারছে হিয়া দিয়ার মনটা ভালো নেই।কাল পিয়ালীদের বাসায় গিয়ে ৩বোন দূরে কোথাও ঘুরতে যাবে।তাতে দিয়ার মন-টা ফ্রেশ হবে একটু হলেও।
কিন্তু কাল যে একটি অভিশপ্ত দিন অপেক্ষা করছে ভাবতে পারেনি সে।
.
আজ দিয়া আর হিয়া ফুফুর বাসায় যাবে।দু'বোন তৈরী হওয়ার পর হিয়া মোবাইল হাতে নিতেই দেখে জহুরের ৫টা কল।সাইলেন্ট থাকায় খেয়াল করেনি সে।তাড়াতাড়ি কল বেক করে।
-হ্যালো জহুর?
-মনি আমি বাইরে আছি এখন।তোর সাথে পরে কথা বলবো।
-আচ্ছা আমিও পিয়ালীদের বাসায় যাচ্ছি।
-আচ্ছা সাবধানে যা।
ফোনটা রেখে মুচকি হাসতে থাকে হিয়া।তা দেখে দিয়া বলে উঠে-
কিরে আপু কি হলো?
-বাচ্চার মতো তোর ভাইয়া এখনও মনি ডাকে আমায়।১০বছরের সম্পর্কের পরেও কিছু বদলায়নি।
আবারো জারিফের কথা মনে পড়ে যায় দিয়ার।জারিফও তাকে মনি ছাড়া কথা বলতোনা।যেদিন প্রথম মনি ডেকেছিলো সেদিন দিয়া বলেছিলো-
মনি!আমার বান্ধবীদের তাদের বফ-রা বাবু,বেবি,সোনা এসব ডাকে।আর তুমি আমাকে মনি ডাকছো!
-আমার ওসব ভালো লাগেনা।
আমি তোমাকে পাখি,মনি এসব-ই ডাকবো।
-আর আমি?
-তোমার যা খুশি।
-ভেবে দেখি।
-দেখো।
-উম্ম.....গুড্ডুগুড্­ডু!
-এ!!এটা কি?
-জানিনা।কিন্তু আমি তোমাকে গুড্ডু বলেই ডাকবো।
-হেহেহে।ঠিক আছে।
গাড়িতে বসে আছে হিয়া আর দিয়া।দিয়া জানালার দিকে তাকিয়ে ছিলো।দিয়াকে চুপচাপ দেখে হিয়া তার মোবাইল-টি দেখিয়ে বলে উঠলো-মোবাইল নিয়ে কত কতো কষ্ট-টা করেছি আগে।এখন ৪-৫টা রাখলেও কেউ কিছু বলবেনা।
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)