বান্ধবী - সাজি আফরোজ (পর্ব ৩)


ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে নিজের চুল আঁচড়ে চলেছে ঝুমু।
হঠাৎ মুনিয়া এসে এক ডজন কাচের চুড়ি দেখিয়ে বললো-
তোর না কাচের চুড়ি পছন্দ? দেখ নীল চুড়ি এনেছি।
.
ঝুমু মুখে হাসিয়ে ফুটিয়ে চুড়ি গুলো নিতে চায়লে মুনিয়া বললো-
আমি পরিয়ে দিচ্ছি।
.
মুনিয়া ঝুমুর হাতে চুড়ি পরিয়ে দিতে থাকলো। ঝুমু ভ্রু জোড়া কুচকে বললো-
আমার কেনো যেনো মনেহচ্ছে তুই কোনো মতলবে এসেছিস?
.
ঝুমুর কথা শুনে উচ্চ শব্দে হেসে উঠলো মুনিয়া। তার হাসি দেখে ঝুমু বললো-
আগেই বুঝেছি।
-কেনো! আমি বুঝি মতলবেই তোকে উপহার দিই?
-মতলবের সময় তোর মুখের ধরণ কেমন হয়ে যায় সেটা আমার অজানা না। এবার বল মতলব টা কি?
-বলবো?
-হু।
-ফারুক বললো আমাদের বের হতে। তার ইমরুল ভাইকে নিয়ে এলাকা ঘুরে দেখানোর জন্য।
-আমরা কেনো!
-ও ছোট মানুষ, ওর সাথে...
-বুঝলাম৷ দাঁড়া আমি তৈরী হয়ে আসি।
.
চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে গেলো ঝুমু।
মুনিয়া একটু অবাকই হলো। এতো সহজে যে রাজী হবে ঝুমু ভাবতে পারেনি সে। তবে সে ঝুমুকে মিথ্যেও বলেছে। বের হবার ইমরুল বলেছে শুনলে নিশ্চয় রাজী হতোনা।
.
.
মোহাম্মদ পুর...
এলাকাটা বেশ বড়।
আজ ইমরুলকে এলাকা ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে মুনিয়া, ঝুমু ও ফারুক।
মুনিয়া ও ঝুমু দুজনের হাতের নীল রঙের কাচের চুড়ি। হঠাৎ হঠাৎ চুড়ির রিনিঝিনি শব্দ শুনতে যেনো ভালোই লাগছে ইমরুলের। তবে কার চুড়ির শব্দে মাতাল হচ্ছে সে? চুড়ি তো দুজনি পরেছে।
ইমরুলকে ডেকে ঝুমু বললো-
ওই যে দেখুন? এটা আমাদের এলাকার সব চেয়ে বড় পুকুর।
-পুকুর পাড়টি বেশ সুন্দর তো! মনেহচ্ছে কোনো গ্রামে এসেছি।
.
মুনিয়া ঘাটে নেমে সিড়িতে বসে পানিতে পা ভেজাতে লাগলো।
ইমরুল তার পাশে এসে বললো-
ঠিক এই মুহুর্তে গ্রামের সোনার কন্যার মতো লাগছে আপনাকে।
-আমরা দুজনেই আপনার ছোট হবো। তুমি করেই বলতে পারেন।
-এতো তাড়াতাড়ি তুমি বলা টা ঠিক হবে?
-ঘুরতে আসতে পারলে তুমি কেনো নয়!
.
ইমরুল মৃদু হেসে বললো-
বুদ্ধিমতী।
.
এর মধ্যেই ফোন বেজে উঠলো মুনিয়ার।
রিসিভ করে ওপাশের কথা শুনে রাগান্বিত কণ্ঠে সে বললো-
এমনিতেই কথা বলবে মানে! একটা ছেলের সাথে আমার কিসের কথা থাকতে পারে? আমি ওই ছেলের সাথে না চ্যাট করবো না কোনো কথা বলবো। তুই আমাকে এই বিষয়ে আর বিরক্ত করিস না।
.
মুনিয়া ফোন রেখে আবারো পা ভেজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। পুকুর পাড় তার প্রিয় জায়গার মধ্যে একটি।
এদিকে ঝুমুর পাশে ইমরুল এসে বললো-
মুনিয়া এতো চটে যাওয়ার কারণ টা কি?
-আসলে ওকে একটা ছেলে পছন্দ করে। আমাদের একটা কলেজ ফ্রেন্ডকে জানিয়েছে ছেলেটি। মুনিয়া রিজেক্ট করার পরেও কথা বলতে চায় মুনিয়ার সাথে। তাই...
-মুনিয়া ছেলেদের সাথে এভাবে কথা বলা পছন্দ করেনা! ভেরি গুড!
.
ইমরুলের মুখে কথাটি শুনে কিছু বললো না ঝুমু।
ইমরুল আবারো বললো-
আমি আরো চেয়েছিলাম মুনিয়ার ফোন নাম্বার নিয়ে ওকে পটানোর চেষ্টা করবো।
-সিরিয়াসলি! আমি দিচ্ছি নাম্বার। নিন!
-আমি তো...
.
কথার মাঝেই ফারুক এসে বললো-
ওদিকে ব্যাডমিন্টন খেলা হচ্ছে। আমি এক দফা খেলে আসি, তোমরা গল্প করো।
.
মুনিয়া কথাটি শুনে দ্রুত এগিয়ে এসে বললো-
তুই একা খেলবি কেনো! আমিও খেলবো।
.
ইমরুল বললো-
আপনি খেলতে জানেন?
-আমার সাথে খেললে হারতে হবে এটা জানি।
-তাহলে হয়ে যাক খেলা?
.
.
ইমরুল ও মুনিয়া ব্যাডমিন্টন খেলায় মেতে আছে। তাদের খেলা দেখছে ঝুমু। ইমরুল চেঁচিয়ে বললো-
মিস ঝুমু? আপনি খেলবেন না?
-আমি পারিনা। আপনারা খেলুন।
.
.
.
বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। ইমরুল যে কি করে এতোদিন এখানে থেকে যাচ্ছে তার মামা-মামী বুঝতেই পারছেন না। যে ছেলেকে এতোবার বলেও আনা যেতোনা সেই নাকি এই বাড়ি ছেড়ে যেতে চায়ছেনা! এতে বরং খুশিই তার মামা-মামী। বাড়িতে তারা তিনজন ছাড়া আর কেউ নেই। ইমরুল আসার পর বাড়িটা যেনো পূর্ণতা পেলো। কেননা ইমরুল স্বভাবে ভীষণ মিশুক।
.
.
অবশেষে মনের আশা পূরণ হতে চলেছে মুনিয়ার। ইমরুল বলেছে সে ও ঝুমুর সাথে বাইরে কোথাও যেতে চায় সে। এই দিনটারই যেনো অপেক্ষায় ছিলো মুনিয়া।
তবে এতোদিন যে সে ঝুমু সেজে ইমরুলের সাথে চ্যাট করেছে এটা ইমরুল ও ঝুমু দুজনেরই অজানা। যদিও তেমন কোনো চ্যাট তাদের মাঝে হয়নি। খবরাখবর নেয় ইমরুল। সেও নেয়। এতে করে ঝুমুর কোনো অসুবিধে থাকতে পারে বলে মনেহয়না তার। তবে সে যে প্রেমে পড়েছে এটা জানানো হয়নি ঝুমুকে। আসলেই কি পড়েছে? নাকি এটা শুধুই মোহ?
.
.
রেস্টুরেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে ইমরুলের জন্য অপেক্ষা করছে ঝুমু ও মুনিয়া।
এলাকার কেউ দেখবে বলে ইমরুলকে সাথে আনেনি তারা।
মুনিয়া ঝুমুকে ইমরুলের কথাটি বলবে কিনা ভাবতে লাগলো সে। তার মাঝেই একটা ছোট বাচ্চা এসে ঝুমুর উড়না টেনে রেস্টুরেন্টের দিকে দেখিয়ে দিয়ে বললো-
আমি কোনোদিন ওই দোকানের খাবার খাইনাই। কিছু কিনা দিবা আমারে?
-কেনো নয়! কি খাবে বলো?
.
-ওকে আমাদের সাথে নিয়ে যাই ভেতরে? আজকের ট্রিটটা কিন্তু আমার দেয়া কথা।
.
ইমরুলের মুখে কথাটি শুনে চমকালো ঝুমু।
ইমরুল তাদের নিয়ে পথশিশুটির সাথে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলো। শুধু তাই নয়, নিজের হাতে ছেলেটিয়ে খাইয়ে দিলো সে, ছেলেটি নিজের হাতে ভালোভাবে খেতে পারছিলোনা বলে। হাতে ব্যান্ডেজ ছিলো তার।
এমন একটা দৃশ্য দেখে খুব অবাকই হলো মুনিয়া ও ঝুমু। দুজনেই উপভোগ করতে লাগলো, ভালো লাগার মতো এই দৃশ্যটি।
.
.
সেই রাতেই ঠিক ৯টায় পুকুর পাড়ে একা বসে আছে ঝুমু।
আজ তার ভাইকে ভীষণ মনে পড়ছে তার।
ঝুমুর ভাই নির্জন। দুজনেই সমবয়সী ছিলো। একটা এক্সিডেন্টে মৃত্যু হয় তার। ভাই এর কথা মনে হলেই চারদিক অন্ধকার মনেহয় ঝুমুর কাছে। কি এমন ক্ষতি হতো? তার ভাইটা পৃথিবীতে থাকলে?
.
-এতো রাতে আপনি এখানে?
.
ইমরুলের গলার স্বর চিনতে ভুল করলোনা ঝুমু।
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো-
ভালো লাগছিলো না।
-কি হয়েছে বলা যাবে?
.
ঝুমুর মুখে সবটা শুনে তাকে নানাভাবে হাসানোর চেষ্টা করতে লাগলো ইমরুল। এতে করে যদি মনটা ভালো হয় ঝুমুর। হঠাৎ ইমরুলের ফোন বেজে উঠলে সে রিসিভ করে বললো-
ফোনটা রাখ। আমি একজনকে হাসাতে ব্যস্ত আছি এখন।
.
ইমরুলের কথাটি শুনেই হেসে দিলো ঝুমু। ইমরুল বললো-
যাক! অবশেষে হাসাতে পারলাম আপনাকে!
.
এদিকে ঝুমুর খোঁজে বাইরে ঘুরছে মুনিয়া।
বড় রাস্তায় চোখ পড়তে দেখলো, ইমরুল ও ঝুমু এগিয়ে আসছে তার দিকে।
ইমরুল মুনিয়ার উদ্দেশ্যে বললো-
নাও তোমার বনুকে। পুকুরপাড়ে বসে বসে চোখের পানি ফেলছিলো।
.
মুনিয়া বললো-
কি হয়েছে ঝুমু তোর?
-কিছু নারে। বাসায় চল।
-হু। ফোনটাও আনিস নি। আঙ্কেল আন্টি টেনশন করছে। চল।
.
ইমরুল বললো-
মুনিয়া? পৌঁছে দিবো আমি?
-না যেতে পারবো। আপনি বাসায় যান। আমি গিয়ে জানাবো আপনাকে।
-তোমার ফোন নাম্বার কিন্তু আমার কাছে নেই।
-আমার কাছে আছে।
-হু ঝুমুর কাছে আছে মানে তো তোমার কাছেও আছে।
.
দুজনেই হাসলো। ইমরুলের ফোনে ঝুমুর ফোন নাম্বার তুলে নিজের নামে সেইভ করলো মুনিয়া। এখন এটা ছাড়া যে উপায় নেই আর!
.
ঝুমুকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে নিজের বাসায় আসলো মুনিয়া।
এখন ইমরুল তাকে 'তুমি' বলে ডাকে। ইশ! কি ভালো টাই না লাগে, ইমরুলের মুখে তুমি ডাক!
ফোন হাতে নিয়ে মেসেজ করতে গিয়েও থেমে গেলো সে।
ইমরুল তাকে জানাতে বলেছে বাসায় পৌঁছে, ঝুমুকে নয়! তাই সে এই নাম্বার থেকে জানাতে পারেনা।
কথাটি ভেবেই ঝুমুর নাম্বারে ফোন দিলো সে।
মুনিয়ার ফোন পেয়ে রিসিভ করতেই সে বললো-
ইমরুল কে একটা মেসেজ কর ঝুমু।
-আমি কেনো মেসেজ করবো?
-বাসায় পৌঁছে জানাতে বলেছিলো।
-সেটা তো তোকে বলেছিলো।
-কিন্তু আমি যে তোর নাম্বার দিয়েছি।
-কেনো?
-ভুলে যাচ্ছিস?
.
ঝুমুর সবটা মনে হতেই বললো-
হু, মনে পড়েছে।
-আমি ওর নাম্বার সেন্ড করছি তোকে। পাঠিয়ে দিস প্লিজ। আর সে যেনো বুঝতে না পারে তুই মুনিয়া না।
-ঠিক আছে।
.
ইমরুলের নাম্বারে মেসেজ পাঠাতে হাত কাঁপছে ঝুমুর। এমন কেনো হচ্ছে তার সাথে! ছেলেটির কথা বলার ধরণ, অসহায়দের প্রতি আচরণ, খারাপ সময়ে হাসানো সব কিছুতেই যেনো ভালো লাগা কাজ করছে। ঝুমু শুনেছে, যদি কোনো ছেলে জীবনের খারাপ মুহূর্তেও তোমাকে হাসাতে পারে তবে সে নিঃস্বন্দেহে আজীবন তোমাকে আগলে রাখতে পারবে।
.
তবে কি ঝুমুর জীবনের স্বপ্নের পুরুষটি ইমরুল? ইমরুলের জন্য তার মনে আলাদা একটি জায়গা হয়েছে!
কাঁপাকাঁপা হাতে ঝুমু টাইপ করে পাঠালো-
আমরা এসেছি বাসায় বেশ কিছুক্ষণ হলো।
.
সাথে সাথেই ওপাশ থেকে রিপ্লাই আসলো-
ঝুমু কেমন আছে এখন? ওকে ওমন মনমরা দেখতে ভালো লাগেনা। খেয়াল রেখো ওর। যদিও এটা তোমাকে বলার কিছু নেই আমি জানি৷ তবুও চিন্তা হচ্ছিলো তাই বললাম।
.
ঝুমু রিপ্লাই দিলো-
হ্যাঁ ভালো আছে।
.
ওপাশ থেকে আবার রিপ্লাই আসলো-
আমি ওকে মেসেজ দিয়ে বিরক্ত করছিনা। নাহলে নিজেই খবর নিতাম। এখন তোমাকেও আর বিরক্ত করবোনা। সময় কাটাও ঝুমুর সাথে। ভালো লাগবে ওর। ভালো থেকো।
.
ঝুমুর জন্য চিন্তা হয় ইমরুলের! আর এতো কিছু ভাবে সে তার জন্য? তাহলে ইমরুলের মনেও কি জায়গা সৃষ্টি হলো ঝুমুর জন্য?
এসব ভেবে লজ্জায় লাল হয়ে গেলো ঝুমুর মুখটা। সে যে প্রেমে পড়েছে! আর এই কথাটি সবার আগে মুনিয়াকেই জানাতে চায় সে।
.
এদিকে মুনিয়াও ইমরুলের চিন্তায় মগ্ন।
মোবাইলে তোলা ইমরুলের ছবি দেখে বিড়বিড়িয়ে বলছে-
এটা কোনো মোহ নয়। হতেই পারেনা! এটা শুধুই ভালোবাসা। আমি কালই ঝুমুকে জানাবো সবটা।
.
চলবে

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)