ফিরে পাওয়া সেই অতীত - সাজি আফরোজ (পার্ট ১)


বউ সেজে বাসর ঘরে বসে আছে নিপা।পুরো ঘরটা ফুলে সাজানো।জমকালো ভাবে বিয়ে হয়েছে তার।সবাই খুশি।তবে সে নয়।অবশ্য তাতে কারো কিছু যায় আসেনা।নাহলে কি আর তনয় এর সাথে বিয়ে না দিয়ে এই রাসেল নামক মানুষ টার সাথে বিয়ে দিতো!তার জীবনটাও অন্যসব ব্যর্থ প্রেমিকার মতো হয়ে গেলো।
তনয়....
নিপার ভালোবাসা।নিপাদের বাড়ির পেছনেই তনয়দের বাড়ি।তনয় দেখতে কালো হলেও মনটা অনেক ভালো।বেপরোয়া একটা ছেলে।পুরো পাড়া টই টই করে বেড়াতো।পড়ালেখার প্রতি তেমন একটা টান ছিলোনা।তাদের বাসার আর্থিক অবস্থা ও এত ভালো ছিলোনা।
অপরদিকে নিপা অনেক সুন্দরী।যে কারো নজর কাড়ার মত।পড়ালেখায় পারদর্শী।বাসার আর্থিক অবস্থা ভালো।বলতে গেলে সব দিক থেকেই তনয় এর বিপরীত।
ভালোবাসা কি আর তফাৎ মানে!তনয় এর চঞ্চলতার প্রেমেই পড়েছিল নিপা।অবশ্য তনয়-ই তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছিল।
এইতো ৯ বছর আগের কথা---

স্কুলে যাওয়ার পথে তনয় তার পিছু নিতো।একদিন সরাসরি এসে নিপাকে জানায় তনয় তাকে ভালোবাসে।নিপা বাসুক না বাসুক সে জানতে চায়না।শুধু জানে নিপা তার।
কোন কথা বলতে দেয়নি নিপাকে।বেশ অবাক হয়েছিল নিপা।কতো ছেলে তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে তবে তনয় এর মত এভাবে কেউ সাহস দেখায়নি।একই পাড়ার বলে কি সাহস দেখালো ছেলেটা!
এভাবে প্রায় নিপার পিছু নিতো সে।নিপার কেন জানি ভাল লাগতো।
হঠাৎ একদিন তনয় নিপার সামনে এসে তার হাতে একটি চিঠি ধরিয়ে দিয়ে চলে গেলো।বাসায় গিয়ে সে চিঠিটি খুললো।তাতে লিখা ছিলো-
"সেদিন খুব খারাপ ভাবেই বলে ফেলেছি তোমাকে।তার জন্য দুঃখিত আমি।নিপা তোমাকে আমি ভালোবাসি তবে আমাকেও তোমার ভালোবাসা টা জরুরী।দুজনের ভালোবাসা ছাড়া সম্পর্ক কি হয় বলো!?তুমি যদি না চাও আমি তোমার পিছু আর নিবোনা।জানি তুমি অনেক সুন্দরি।তবে অন্যসব সুন্দরী মেয়েদের মতো নও।অনেক আলাদা আর তাই তোমার প্রেমে পড়েছি আমি।নিপা তুমি কি পারোনা আমার চেহারা না দেখে এই মন টা দেখে আমায় ভালোবাসতে?কথা দিচ্ছি অনেক সুখে রাখবো তোমায়"।
সেদিন নিপা আসলেই তনয়ের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল চিঠিটা দেখে।
তাই পরেরদিন যখন তনয় কে দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল নিজে গিয়ে বলেছিল,
"এই যে এখন থেকে আর পিছু নিবেন না"।
কথাটাই তনয় এর মুখটা দেখার মত ছিলো,বুঝায় যাচ্ছিল বেচারা কষ্ট পেয়েছে। তাই দেরী না করেই বলে দিয়েছিল নিপা,
"পিছে নয় তবে সাথে সাথে হঁাটবেন "।
হুম সেদিন থেকেই শুরু হয় নিপা আর তনয় এর প্রেম।
হঠাৎ দরজার শব্দ।ভাবনার জগৎ থেকে বের হয় নিপা।রাসেল নামক মানুষ টা এসেছে।
দরজা বন্ধ করে তার কাছে এসে বসেছে।নিপার সহ্য হচ্ছেনা এই মানুষ টাকে।
রাসেল....
চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগ এ পড়াশোনা শেষ করে এখন উকিল।
বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সে।বাবা-মায়ের কথাতে নিপাকে দেখতে গিয়েছিল সে।একবার দেখাতে তার ভালো লাগে।অবশ্য নিপা যে এই বিয়েতে রাজি হবে তার মনে হয়নি।কারণ সে দেখতে কালো।বিয়ের আগে নিপার সাথে তার কথা হয়নি।পারিবারিক ভাবে খুব তাড়াতাড়ি হলেও জমকালো ভাবেই তাদের বিয়েটা হয়ে যায়।আর আজ বাসর রাতে তাদের প্রথম কথা হবে।
নিপাকে চুপচাপ দেখে রাসেল কথা শুরু করলো।
-বাসর রাতে স্ত্রী এর স্বামীকে কে সালাম করতে হয় জানোনা বুঝি?
-না,আগেতো বিয়ে করিনি তাই।
-হাহা,আমিওতো আগে করিনি।তবে জানি মানে জানাটা দরকার।বাদ দাও দুষ্টুমি করলাম। তুমি নাকি চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস নিয়ে দ্বিতীয় বর্ষে আছো?
-জানেন তো দেখি সব।
-হুম তাতো জানি।তুমি জানোতো আমার সম্পর্কে সব?
-না।
-আস্তে আস্তে জেনে নিবা।
সকালে সূর্য্যের আলোতে ঘুম ভাঙ্গে নিপার।
তবে সে উঠতে পারছেনা বিছানা থেকে।মাথাটা ভার ভার লাগছে তার।তাও উঠার চেষ্টা করে চলেছে।এমন সময় রাসেল এসে তার পাশে বসে বলে-
শুয়ে থাকো।
-কি ভাববে সবাই নতুন বউ এভাবে শুয়ে থাকলে!
-এসব তো জানো দেখছি
-হুম।
মনে পড়ছে নিপার খুব তনয়কে।নিপার স্বামী,শ্বশুড় ও শ্বাশুড়ী সকলে খুব ভালো।অনেক ভালোবাসে তারা নিপাকে।তবুও নিপার মনে যে রয়েছে শুধু তনয়!আচ্ছা কি করছে এখন তনয় টা!
সিগারেট কাল থেকে কতটা খেয়েছে তনয় জানেনা।এখনো তার হাতে আছে।তার ভালোবাসা অন্য কারো ঘরে।তনয় কে ছেড়ে নিপা অন্য কারো কাছে এখন।এতে নিপার দোষ ও নেই অবশ্য।নিপা ও কি তাকে ছাড়া ভালো আছে!আচ্ছা মেয়েটা কি করছে এখন!
২টা দিন চলে যায়।নিপার বাড়ি থেকে মা-বাবা, ভাইসহ আত্নীয়-রা আসে নিপাকে সাথে নিয়ে যেতে।নিপা তাদের সাথে যায়নি।ওই পাড়ায় পা রাখাটা তার পক্ষে সম্ভব নয়।কারো সাথে ভালো করে কথাও বলেনি সে।তার মা-বাবা মনে কষ্ট নিয়ে চলে যায়।বিষয়টা আর কাউকে না ভাবালেও রাসেল কে ভাবায়।তাই আর না ভেবে সরাসরি নিপার কাছেই যায় সে।
-নিপা তুমি আজ যাওনি কেনো?
-আমি গেলে বুঝি খুশি হতেন?
-তা না।তোমার মা-বাবা কষ্ট পেয়েছেন।
-আমার কষ্ট টাও তো তারা দেখেনি।
-মানে??
-কিছুনা।আপনার খারাপ লাগলে বলুন আমি আর কোথাও চলে যাবো।
-আরে রাগ করছো কেনো!আমিতো এমনেই বললাম।আমার সুন্দরী বউ আমার কাছে থাকলেইতো খুশি আমি।
তনয় রাস্তায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে নিপাকে এক নজর দেখার জন্য।নিপাদের গাড়িটা দেখতে পেলো।একে একে সবাই নামলেও নিপা নামেনি।তবে কি আসেনি নিপা!এতো অভিমানী কেনো মেয়েটা!তার জন্য যে তনয় অপেক্ষা করছে সে কি তা জানেনা!?
হুম নিপা জানে তনয় দাঁড়িয়ে থাকবে।তবে এই মুখটা তনয় কে দেখাতে সে আর চায়না।
আস্তে আস্তে সবার সাথে মানিয়ে চলছে নিপা।তবে রাসেলের সাথে সে সহজ হতে পারছেনা।রাসেল তা বুঝতে পেরে অফিস থেকে প্রতিদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরে।ফেরার সময় ফুল,আইসক্রিম কিছুনা কিছু সাথে করে নিয়ে আসে।
তবুও সেতো রাসেল,তনয় নয়।তনয় হলে হয়তো দিনগুলো অন্যরকম যেতো নিপার।
একদিন বিকেলে রাসেল নিপার কাছে জানতে চায়..
-এতো দূরে দূরে থাকো কেনো আমার কাছ থেকে?
-নাতো।লাগছে আপনার।
-মত ছিলনা এই বিয়েতে?
-তেমন কিছু নয়।
-চল দূরে কোথাও ঘুরতে যাই।হানিমুনে তো যাওয়া হলোনা আমাদের।
হানিমুনের কথা আসতেই বুকটা কেপে উঠল নিপার।কত কিছুই না ভেবে রেখেছিল তনয় এর সাথে হানিমুন নিয়ে।না তার পক্ষে সম্ভব না যাওয়া।তাই কিছুক্ষণ চুপ থেকে জবাব দিলো-
আমি ক্লাস করতে চাই।
-এটাতো ভালো কথা।শিক্ষিত বউ কে না চায়!
এখন নিপা পড়াশোনা শুরু করেছে।পড়ালেখার মাঝে নিজেকে ব্যস্ত রাখতে চায় সে।যেকোনো কিছুর বিনিময়ে তনয় কে সে ভূলতে চায়।আচ্ছা তনয় টাও কি চায় তাকে ভূলে যেতে!
না তনয় নিপাকে ভূলতে পারছেনা আর ভূলতে চায় ও না।নিপার তো দোষ ছিলোনা কোনো।কি করে ভূলবে তাকে।তার ও দোষ ছিলোনা।তবুও নিপা কি তাকে ভূলে যাবে!খুব জানতে ইচ্ছা করে তনয় এর।সে চায় নিপা সুখে থাক।তবুও মনতো মানেনা।নিপা কি তাকে মনে রেখেছে,জানতে তার ইচ্ছা হয় খুব।
৬টা মাস কেটে যায়।
একদিন খবর আসে নিপার বাবার খুব অসুখ।এতদিন নিপা বাবার বাড়ি যায়নি।ফোন এর নাম্বার ও বদলে দিয়েছিল।তাও রাসেলের থেকে তারা নাম্বার নিলেও নিপা কথা বলতোনা।তবে বাবার অসুখের কথা শুনে নিপা ঠিক থাকতে পারেনি।রাসেল কে সাথে নিয়ে চলে যায় বাবার বাড়ি।
৬মাস পর নিপা তার রুমে।বাবা কে দেখে নিজের রুমে এসেছে সে।ঠিক নিপা যেভাবে রাখতো ওইভাবেই তার রুমটা সাজানো।খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে কি তার পরিবার কে!তারাতো তার ভালোর জন্যই রাসেল এর সাথে তার বিয়ে দেয়।ভাবতে ভাবতে রাসেল আসে।
-নিপা তোমাদের বাড়ি দেখাবেনা ঘুরে?সেই তোমাকে দেখতে এসেছিলাম।আরতো আসা হয়নি।
নিপা পুরো বাড়ি ঘুরে দেখিয়ে রাসেল কে নিয়ে ছাদে উঠলো।রাস্তায় চোখ পড়তেই মনে পড়ে তনয় এর কথা।ভালো করে তাকাতেই দেখে কেউ একটা দাঁড়িয়ে আছে।মুখে দাড়ি,লম্বা চুল।একি!এটাতো তনয়।হুম এটা নিপার তনয়।এমন অবস্থা কেনো তার!সামলাতে পারেনি নিজেকে নিপা।কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় নিচে।রাসেল কিছু বুঝতে না পেরে তার পিছে ছুটে যায়।তনয় সবটা দেখে।সেতো খবর পেয়ে একনজর দেখতে এসেছিল নিপাকে।যেমনটা আগে বিকালে আসতো।কষ্ট দিতে চায়নি নিপাকে।তাহলে নিপাকি এখনো রাসেল এর সাথে স্বাভাবিক হয়নি?!
হুম হতে পারেনি।তবে সে রাসেল কে ঠকাতেও চায়না।চেষ্টা করে তাকে,তার পরিবার কে সুখে রাখতে।তবুও নিজেকে অপরাধী মনেহয়।
তনয়ের অপরাধী সাথে রাসেলের ও।
সেদিনের পর থেকে নিপার বাসার সাথে নিপার যোগাযোগ শুরু হয়।কতদিন আর কষ্ট দিবে নিজের পরিবার কে।তবে
সেদিন এর পর থেকে নিপা এসেছে জানলেও তনয় তার সামনে যায়নি আর।কি লাভ মেয়েটাকে কষ্ট দিয়ে।মেয়েটাতো চেয়েছিল তার জীবণে আসতে।এইতো মনে পড়ে ওইদিনের কথা,নিপার জন্য বাসা থেকে পাত্র দেখছিলো।নিপা তনয় এর আম্মা কে নিয়ে বাসায় প্রস্তাব দিতে বলে তনয়কে।
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)