শেষ থেকে শুরু - সাজি আফরোজ (পর্ব ১)


বাসায় নিজের বিয়ের কথা সবেমাত্র বললাম। তারা কোনো মত জানায়নি। এর উপর যাকে বিয়ে করতে চাইছি তার মায়ের বিয়ের কথা শুনলে বাসার সবাই কিভাবে নিবে বিষয়টা!!
.
আপনমনে এসব ভেবে অস্থির হয়ে আছে সাব্বিরের মন।
খানিকক্ষণ নিজের রুমে পায়চারি করে ফোনটা হাতে নিয়ে ডায়াল করলো শাম্মীর নাম্বারে।
একবার রিং হতেই শাম্মী রিসিভ করে বললো-
আমি তোমাকেই ফোন দিতে চাইছিলাম। মি. ফিরোজের ফেবু আইডি পেয়েছি আমি। তাকে নকও দিয়েছি। এখন শুধু তিনি রিপ্লাই দেবার পালা।
-কি করছো তা ভেবে করছো তো শাম্মী?
-কেনো বলছো এমন?
-আন্টির বয়স প্রায় ৪০এর কাছাকাছি। এখন তাকে তুমি আবার বিয়ে দিতে চাইছো। এই বয়সে এসব কি শোভা পায়? দৃষ্টিকটু লাগবেনা পুরো বিষয়টা?
-সাব্বির! কি যে বলোনা তুমি! কার কি লেগেছে তাতে আমার কখনো কিছু যায় এসেছে! আসেনি তো না?
-হুম।
-এখন আমি আমার মায়ের সুখ টাকেই বড় করে দেখছি। অন্য কিছু ভাবছি না।
-আন্টি জানেন তোমার পরিকল্পনা?
-জানানো হয়নি এখনো। আগে মি. ফিরোজের সাথে কথা বলে নিই। তিনি যদি রাজী থাকেন তবেই মা কে জানাবো।
.
.
.
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে এলি। চোখে মুখে তার এক রাশ অস্বস্থি। ২০বছর পর আজ তার ফিরোজের সাথে দেখা হয়েছে। তাকে দেখেই মনের কোণে জমে থাকা স্মৃতিটা চোখের সামনে ভেসে উঠেছে এলির। ইচ্ছে করছিলো সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে। ইচ্ছে করেছে একটিবার তার বুকে মাথা রেখে বলতে, ভালোবাসি। কিন্তু পাশে শাম্মীর ডাকে ঘোরটা কেটেছিলো তার।
পরক্ষণেই মনে হলো, অনেকটা সময় পার হয়ে গিয়েছে। প্রায় ২০বছর! শাম্মী আর শাকিলের মা সে। অতীত নিয়ে ভাবাও যে পাপ!
পাশ কেটে চলে যেতে চাইলেও ফিরোজের ডাকে থামতে হয়েছিলো তাকে।
দুটো কথা হয়েছে তাদের। তার মাঝেই জেনেছে ফিরোজ এখনো বিয়েই করেনি! সেই যে ১৯বছর আগে বিদেশে গমন করেছিলো আজ দুদিন হলো দেশে ফিরেছে। আর আজই দেখা হয়ে গিয়েছে তাদের শপিংমলে।
.
এই সামান্য কথার মাঝেই শাম্মী কতো সহজে বুঝে নিয়েছে এই হলো তার মায়ের প্রাক্তন প্রেমিক! যাকে ছেড়ে সে কিনা অন্য আরেকজন কে বিয়ে করেছিলো।
বাসায় এসেই মায়ের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়েছে শাম্মী-
আজও ভালোবাসো তাকে তাইনা?
.
না চাইতেও মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছিলো এলির-
হু।
.
আর সেই থেকেই অন্যরকম একটা অস্বস্থি কাজ করছে নিজের মাঝে।
কি ভেবেছে তাকে শাম্মী! প্রাক্তন প্রেমিক কে তার মা এখনো ভুলতে পারেনি। তাহলে এতোবছর এই সংসারে তাদের সাথে থেকে ভালোবাসার অভিনয় করেছে সে! এমন একটা ভাবনা নিশ্চয় শাম্মীর মনে ঘুরবে।
কি দরকার ছিলো? মুখ ফসকে হু বলার!
.
.
.
বাবার ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে শাম্মী। মুখে তার হাসির ঝলক থাকলেও চোখ দুটো ছলছলে। যেনো চোখ বেয়ে এখুনি খুশির কান্না ঝরবে!
দেওয়ালে টাঙানো ছবিটার উপর হাত রেখে শাম্মী বললো, আমি কি ভুল কিছু করছি বাবা? ১০টা বছর আগে তুমি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছো ওপারে। কিন্তু মা একটি বারের জন্যও একা ছাড়েনি আমাকে। শাকিল তো অনেক ছোট ছিলো। একা হাতেই মা সবটা সামলিয়েছে। তোমার কি মনে হয়না মায়ের কিছুটা সুখ প্রাপ্য?
.
ছবির উপর থেকে হাতটা সরিয়ে চোখের কোণে জমে থাকা পানিগুলো মুছে নিলো শাম্মী। আবারো সে বললো-
কে কি করেছে, কে কি ভাবছে এসব আমি ভাববো না। মি. ফিরোজের চোখে আমি মায়ের প্রতি ভালোবাসা দেখেছি। তিনি এখনো হৃদয়ের গহীন থেকে মাকেই ভালোবাসেন। তাইতো তিনি বিয়েই করেননি। চেষ্টা করেননি মায়ের জায়গা অন্য কাউকে দিতে। আমি চাই মি. ফিরোজের ভালোবাসা পূর্ণতা পাক।
.
.
.
শপিংমলে এতোবছর পর এভাবে এলিকে দেখতে পাবে ভাবেনি ফিরোজ।
সময় অনেকখানি চলে গেলেও মেয়েটা আগের মতোই রয়ে গিয়েছে। মুখের সেই হাসিটা আগের মতোই, যে কারো নয়ন কাড়তে পারবে।
তাকে দেখে কেউ বলবে তার বয়স ৪০এর কাছাকাছি? কখনো না।
.
নিজের মনে কথাগুলো বলে আয়নার সামনে দাঁড়ালো ফিরোজ।
কেউ দেখলে কি তাকে বলবে, একসময় এলির ক্লাসমেট ছিলো সে?
আপনমনে কিছুক্ষণ হাসলো ফিরোজ। পরক্ষণেই আবার মনটা খারাপ হয়ে গেলো তার।
যেই এলির জন্য বিদেশ গমন করতে হয়েছে, দেশে এসেই কিনা সেই এলির মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে!
ভালোই তো আছে সে স্বামী, সন্তান নিয়ে। কিন্তু সে নিজে কেনো সবটা জানার পরেও সংসার জীবন থেকে দূরে থাকলো? এলির জায়গা কাউকে দিতে পারবে না বলে?
.
-কি করছিস?
.
মায়ের ডাকে চিন্তার জগৎ থেকে বেরিয়ে আসলো ফিরোজ।
মায়ের উদ্দেশ্যে সে বললো-
আসো মা, বসো।
.
খাটের উপর বসতে বসতে ফিরোজের মা বললেন-
একটা আবদার নিয়ে আসলাম তোর কাছে বাবা।
.
মায়ের পাশে বসে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফিরোজ বললো, কিসের আবদার?
-এইবার বিয়েটা করে নে।
.
মায়ের কথায় হেসে উঠলো ফিরোজ।
মায়ের বিরক্তি ভরা ভ্রু জোড়ার দিকে তাকিয়ে সে বললো-
আমার আর সেই বয়স আছে মা?
-কি বলিস! ছেলেদের বিয়ের বয়স যায়না। তার উপর এতো টাকা তোর, মেয়ে দেখার দায়িত্ব আমার।
-কিন্তু....
-মরার আগে আমার এই ইচ্ছেটা পূরণ করবি না? তোর বাবা তো মরেই গেল বড় ছেলের বউ না দেখে। শেষ বারের মতো ছেলেটাকেও দেখতে পায়নি। এখন তুই আমার আশাও পূরণ করবি না? এক বুক দুঃখ নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবো আমি, এটাই চাস?
.
হঠাৎ বুকটা ধুক করে উঠলো ফিরোজের। অজানা এক ভয় কাজ করছে মনের মাঝে।
খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেলেছে কি সে নিজের পরিবারকে? হয়তো হ্যাঁ!
.
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে মায়ের উদ্দেশ্যে সে বললো-
তুমি যা বলো তাই হবে মা।
.
কথাটি শুনেই ফিরোজের মায়ের চোখ জোড়া ছলছল করে উঠলো। খুশিতে বলে উঠলেন তিনি-
আমি এখুনি ঘটককে খবর দিচ্ছি।
.
কথাটি বলেই ফিরোজের মা রুম থেকে বেরিয়ে পড়লেন।
এদিকে ফিরোজ পড়ে গেলো ভাবনায়।
হুট করেই মায়ের মন রাখতে এমন একটা কথা বলে ফেলেছে সে। কিন্তু তার নিজের মন তো সাই দিচ্ছেনা। কি হবে এর পরিণতি!
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)