ডিটেকটিভ তিশা - শাহেদুল ইসলাম মাহিম (পর্ব ১)



৫০ লাখ টাকার চেকটি ছিড়ে ফেলতে দেখে যতটা না আমিন সাহেব অবাক হয়েছেন তার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছে হুরাইরা আর বর্ণ।
কারণ সকাল থেকেই ডিটেকটিভ তিশা বাড়ি মাথায় তুলেছে তার নতুন কেইস চায় বলে বলে।
আর এখন এতো ভালো একটা অফার সে নিলো না!
এই ভাবনায় বর্ণ হুরাইরা দুজন দু'জনের দিকে তাকিয়ে আছে।
আমিন সাহেবও হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেলো তিশার বাসা থেকে।
বর্ণ হলো তিশার হাসবেন্ড আর হুরাইরা তার বোন।
আর আমিন সাহেব হলেন শহুরের নামি দামিদের মধ্যে একজন।
বর্ণ কিছুটা বিরক্ত ভাব দেখিয়ে নিজের সাইন্সল্যাবে চলে গেলো।
হুরাইরা আপু বলে উঠতেই তিশা হুরাইরাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,
- আমিন সাহেব নিজেই ড্রাগ সাপ্লাই কাজে জড়িত আছেন।
আর কারা এসব করছে এসব বের করার ছলনায় তিনি আমার প্লেনটি শুনে নিতে চেয়েছিলেন,
যাতে করে অন্য উপায়ে সেই পাশের এরিয়াতে ড্রাগের ব্যাবসা অনায়াসে করতে পারেন।
শহরের কিছু পুলিশ অফিসার আমিন স্যারের পকেটে থাকলেও ডিটেকটিভ তিশার হাত ছিলো অনেক উপরে।
এলাকায় মানুষ হারিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে বদনা চুরির কেইস পর্যন্ত সলভ করেছে ডিটেকটিভ তিশা।
এমন কোন কেইস নেই যা তিশা সলভ করতে পারবে না।
কিন্তু এইবারের কেইসটি তিশার জীবনে একটি বড় অন্ধকার হানিয়ে আনছে।
সন্ধ্যায় তিশা মোবাইলটি নিয়ে ডায়েল নাম্বারে সাব্বিরের নাম্বার তুলে যেই কল অপশনে ক্লিক করবে বর্ণ এসে তিশাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে।
তিশা চমকে উঠে।
তিশার কানে মুখ নিয়ে বর্ণ,
- ম্যামকে দেখছি সকাল থেকে বেশ চিন্তিত। খানিকটা রাগান্বিতওতো মনে হয়!
আমি কি কিছু করেছি?
তিশা- নাহ বর্ণমালা তুমি না। যা করেছে ঐ আমিন বেটা করেছে।
কি সাহস দেখো!আমাকে ইনডিরেক্টলি টাকার অফার করেছে, ডিটেকটিভ তিশাকে!!!!
বর্ণকে তিশা বর্ণমালা বলে ডাকে আর হুরাইরাকে হুর বলে।
বর্ণ- আচ্ছা একটা কথা বলোতো, তুমি কীভাবে এতো সিউরিটি দিয়ে বলতে পারছো যে আমিন সাহেবও এতে জড়িত?
তিশা- উহু, শুধু জড়িত না আমিনই মূল।
তুমি একটা জিনিস লক্ষ্য করছো?
আমিন সাহেবের মতে সেখানে খালি পরে থাকা গোর্ডাওনে ড্রাগ সাপ্লাই হয়। তিনি তো চাইলে পারতেন যে পুলিশ ফোর্স নিয়ে গিয়ে সেটি খালি করতে।আর এতো বড় কথার কোন পাঁচ কান নেই। পুলিশও একবারো সেদিকটা গিয়েছে বলে আমার মনে হয় না।
বর্ণ- শুনেছি ড্রাগ ব্যবসায়ে নাকি রাতারাতি অনেক বড়লোক হওয়া যায়।
তিশা- হ্যাঁ, তা তো বটেই। তবে এখানে পুলিশেরও হাত আছে বলে আমার মনে হয়।
ব্যাপারটা এতো দিন তিশার কাছে স্বাভাবিক থাকলেও আজ আমিনের আগমনে ডিটেকটিভ তিশা এক রহস্যের গন্ধ পায়।
ঠিক যেমন পাশের বাসায় কোরবানির গোশত রান্না করলে পাওয়া যায়।
বর্ণ- এতো না ভেবে এদিকে একটু তাকানতো দেখি।
এই বলে তিশাকে ঘুরিয়ে সামনা সামনি দাড় করায়।
- সকাল থেকে দূরে দূরে আছো ঐ আমিন বেটার জন্যে তুমি আজ আমাকে লাভ কিসিও দিলা না।
এই বলে বর্ণ তার ঠোটটি তিশার ঠোটে হালকা ছোয়া লাগাতেই
দরজা থেকে কাশির শব্দ শুনা যায়।
হুরাইরা - এহহেম এহহেম!
সাথে সাথে তিশা বর্ণকে এমন ধাক্কা মারলো সোজা গিয়ে বিছানায় ধপাস করে পরলো।
এদিকে হুরাইরা হাসতে হাসতে মাটিতে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা।
যেনো প্রেমিক প্রেমিকা অবৈধ সম্পর্ক করতে গিয়ে ধরা পরেছে।
তিশা- কিরে তো আক্কেল বলতে কি কিছু নেই? দরজায় নক করে আসবি না?
হুরাইরা- আমার দোষ কি! তোমরা এসব দরজা বন্ধ করে কর‍তে পারো না?
এই বলে অন্য রুমে উদ্দ্যেশ্যে দৌড় দেয়।
তিশাও তার পেছনে ছুটতে যাবে সেই সময় বর্ণ তিশার একটি হাত ধরে টান মেরে তার বুকের উপরে নিয়ে আসে।
বর্ণ- ও কি এসব নতুন দেখছে? এতো রাগ হওয়ার কি আছে?
তিশার মুখটি লজ্জায় লাল হয়ে যায় ওর সাথে সাথে বর্ণের বুকে মুখ লুকানোর চেষ্টা করে।
এসবের মাঝে তিশা ভুলেই যায় সাব্বিরকে ফোন দেওয়ার কথা।
রাত ১০ টায় খাওয়া দাওয়া শেষে হঠাৎ হুরাইরা জোরে জোরে চিৎকার করে উঠে,
তিশা আপু বর্ণ ভাইয়া???
তিশা আর বর্ণ তাড়াতাড়ি করে হুরাইরার রুমে ছুটে যায়।
তিশা- কি হয়েছে হুর?
হুরাইরা - দেখো দেখো আমার মিমি আগে থেকে কত্তো মোটাতাজা হয়েছে!
মিমি হচ্ছে হুরাইরার পোষা বিড়ালের নাম।
তিশা- উফফ তোর এই বাচ্চামির স্বভাব কখন যে যাবে?
এই বলে নিজ রুমে চলে গেলো।
হুরাইরা বর্ণকে উদ্দেশ্য করে বলে,
-ভাইয়া ভাইয়া তোমার ফরমুলা তো একদম পারফেক্ট ভাবে কাজ করছে।
বর্ণ- হ্যাঁ, তবে ওকে আরো কিছু ট্রিটমেন্ট দেওয়া লাগবে।
বর্ণ খুব একটা বড় নাম করতে না পারলেও তার আবিষ্কার গুলো ছিলো অবাক করে দেওয়াত মতো।
রাত ২টা প্রায়
তিশার চোখে ঘুম নেই।
খুব সকালে উঠে তিশা রিভলবারটা আর ক্যামেরাটা কোমরের সাথে বাঁধা ব্যাগে রাখে এবং বেরিয়ে পরে।
বাইরে থেকে দেখতে আর দশটা সাধারণ ব্যাগের মতো মনে হলেও ডিটেকটিভ তিশা সেখানে তার এসব কাজের জিনিস গুলো রাখে।
তিশা মোবাইলটি হাতে নিতেই তার সাব্বিরের কথা মনে পরে।
কাল তাকে ফোন দেওয়া হয়নি।
তিশা ভাবে এ কেইসটাতে তেমন জটিলতা নেই আমিনই সব করাচ্ছে। সাব্বিরকে এ বিষয়ে না জড়ানোটাই ভালো
সাব্বির হলো তিশার ছোট বেলার বন্ধু।
বড়লোকের ছেলে হওয়াতে তিশাকে সব ধরনের সাহায্যই সে করতে পারে।
........
উদ্দেশ্য তিশা গিয়ে কিছু ছবি নেওয়ার চেষ্টা করবে প্রমাণ স্বরুপ।
তিশা জানে সকালে কেও সেখানে থাকবে না তাই এটাই সুযোগ। আর বর্ণ জানলে হইতো চিন্তা করবে তাকে নিয়ে তাই ভোরের সময়টা বেছে নিয়েছে সে।
আপন মনে এসব ভাবতে ভাবতে হাটতে লাগলো।
প্রায় বিশ মিনিট হাটার পর এরিয়াটাতে চলে এলো ডিটেকটিভ তিশা।
দেখে অনেকটা অবাকই হয়ে যায়।
এক সময় এখানে ঘন বসতি ছিলো, বড় বড় বাড়ি সব পরিত্যক্ত। কেও থাকে বলে তো মনেই হচ্ছে না।
সব মিলিয়ে এ যেনো এক ভুতুড়ে পরিবেশ।
আর একদম শেষের দিকেই আমিন সাহেবের গোর্ডাওনটি।
একটু এগোতেই তিশা একটি কালো রং এর কার দেখতে পায়।
সাথে সাথে রিভলবারটা তাক করে একটু একটু সামনে আগাতে থাকে।
এতো সকালে এখানে কে আসতে পারে?
হঠাৎ তিশা অনুভব করলো কে যেনো তাকে ফলো করছে।
কিন্তু পিছনে ফিরে তাকালে কাওকেই সে দেখতে পায় না।
এমন সময় সামনে গোর্ডাওনের ভেতর থেকে গুলির শব্দ।
তিশা সামনে তাকাতেই দেখে আমিন সাহেব গোর্ডাওনের ভেতর থেকে ছুটে আসছে,
এক হাতে পিস্তল আর এক হাতে কালো ব্রিফকেস।
আমিন সাহেব কিছুটা কাছে আসতেই তিশা চমকে উঠে। আমিন সাহেবের একটি কান নেই অঝোরে রক্ত ঝরছে ঐ ছেড়া অংশ দিয়ে।
কি বিশ্রি দেখতে।
আমিন হঠাৎই তার পিস্তলটি ডিটেকটিভ তিশার দিকে তাক করে ছুটে আসতে থাকে।
এই দেখে তিশাও আমিন সাহবের দিকে তার রিভলবারটি তাক করতেই
ঠাস
ঠাস
ঠাস পর তিনটে গুলিতে আমিন সাহেবের মাথার খুলি উড়ে যায়।
তিশা আমিন যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো সেখানে এখানো তাক করে আছে।
কারণ গুলি তিশা চালাইনি।
তিশা পেছিনে ফিরে এদিক অদিক ছুটে খুঁজতে থাকে কাওকে পেলো না।
আসতে আসতে সে আমিনের লাশের দিকে এগোতে থাকে।
তারপর রিভলবারটি ব্যাগে ঢুকিয়ে হ্যান্ড গ্লাবস পরে নেই।
তারপর প্রথমে একবার আমিন সাহেবের গলার পালসে হাত রাখে।
তারপর গুলির নিশান দেখে বুঝতে পারে স্নাইপার শর্ট।
গুলি আশেপাশের কোন বিল্ডিং থেকে চালানো হয়েছে।
কিন্তু তিশা ভাবছে এই নিয়ে তাকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র আমিনকেই কেনো মারব হলো।
কিলার চাইলে তাকেও অনায়াসে মেরে ফেলতে পারতো।
হঠাৎ তার মোবাইল বেজে উঠতেই ভাবনার ঘোর কাটলো।
বর্ণের ফোন।
ওহ ড্যাম!!! এই বলেই রিসিভ করলো।
অস্থির কন্ঠে,
বর্ণ- কোথায় তুমি???
তিশা- আসছি বলেই ফোনটি কেটে দিলো।
তারপর আমিনের হাতে থাকা ব্রিফকেস খুলে দেখলো কয়েকটা ড্রাগসের প্যাকেট আর অনেক গুলো টাকার বান্ডেল।
তারপর তার কান পর্যবেক্ষণ করতে লাগলো।
তার কাছে মনে হচ্ছে কাটা কাটা ছুড়ি দিয়ে কানটি কাটা হয়েছে দেখতে মনে হচ্ছে কোন জীবজন্তুর কামড়।
আমিনের লাশটি একটু কাত করে পিঠের দিকে নজর দিতেই তিশা চমকে উঠলো।
পুরো পিঠ জুড়ে একটি বড় ঘন আঁচড়ের দাগ।
যেনো কোন বাঘের থাবা।
ডিটেকটিভ তিশা আর ভেতরে যাওয়ার সাহস করলো না।
সেখান থেকে একটি ড্রাগের প্যাকেট নিয়ে সে সেখান থেকে চলে আসে।
কিন্তু তার কেইসটা এবার আরো গভীর হলো।তবে ডিটেকটিভ তিশার মনের প্রশ্ন হলো
তাকে কে ফলো করছিলো?
আমিন তো ছিলো মেইন ক্যারেক্টরে তাহলে তার উপর কে গুলি চালিয়েছে?
কি এমন আছে ঐ গোর্ডাওনটাতে যা আমিন সাহেবের একাটি কান ছিন্ন করে ফেলে আর পিঠে এতো বড় আচড় বসায়???
চলবে........

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)