শেষ থেকে শুরু - সাজি আফরোজ (পর্ব ৬)


ঘড়িতে সময় সকাল ৬টা..
আকাশে প্রচণ্ড মেঘ করেছে। একটার পর একটা মেঘ ছুটে ছুটে খেলা করছে পুরো আকাশ জুড়ে! তুমুল বৃষ্টির পূর্বাভাস দিচ্ছে ভেসে বেড়ানো মেঘের এই দল গুলো।
এমন সময় কলিং বেল এর শব্দ শুনতে পেলো এলি।
এতো সকালে, এই সময়ে কে এলো ভাবতে ভাবতে শাড়ির আঁচল ঠিক করে এলি এগিয়ে গেলো সদর দরজার দিকে।
দরজা খুলে কাউকে দেখতে না পেয়ে খানিকটা বিরক্ত হলো সে।
বাইরে কেউ আছে কিনা দেখার জন্য পা দিতেই কিছুর স্পর্শ পেয়ে নিচে তাকালো এলি।
একটা বড় খাম আর একটা লাল গোলাপ চোখে পড়লো তার।
ওসব হাতে নিয়ে সে ভেতরে এসে সোফার উপরে বসে পড়লো।
খামটা খুলতেই একটি বড় কার্ড দেখতে পেলো। তাতে
লেখা আছে-
শুভ জন্মদিন এলি।
.
কার্ডের উপরের লেখা দেখে এলির আর বুঝতে বাকি রইলো না কার লেখা এটি।
এতোবছর পরেও ফিরোজ তার জন্মদিন মনে রেখেছে! নাকি শাম্মি বলেছে তাকে?
আবারো কলিং বেল এর শব্দ হলে দ্রুতবেগে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলো এলি। প্রথমবারের মতো এবারো কারো দেখা পেলোনা এলি। কিন্তু দরজার পাশেই একটি প্যাকেট পেলো সে। প্যাকেটটা হাতে নিয়ে খুলে দেখলো তাতে আছে একটা লাল টকটকে রঙের শাড়ি। সাথে একটা চিরকুটও পেয়েছে সে।
তাতে লেখা-
অনেক শখ ছিলো লাল শাড়িতে তোমাকে দেখবো। ২০বছর আগে যেটা পূরণ করোনি, আজ কি করবে? আজ সন্ধ্যায় শাড়িটা পরবে প্লিজ?
.
এই বয়সে লাল শাড়ি! তাও আবার প্রাক্তন প্রেমিকের জন্য? কখনোই না। কি ভাবছে কি ফিরোজ নিজেকে? এখন কি সেই সময়টা আছে? নেইতো। যেটা হবার নয় কেনো সেটার পেছনে ছুটছে ফিরোজ!
.
.
.
শাম্মির রুমে প্রবেশ করে এলি দেখতে পেলো, কানে ইয়ারফোন গুজে সে নেচে চলেছে।
তার সামনে গিয়ে হাত নেড়ে ইশারা করতেই শাম্মি কান থেকে ইয়ারফোন সরিয়ে বললো-
মা এতো সকালে তুমি?
-কাল যা করেছি বাইরের একটা মানুষের সামনে আমার মোটেও উচিত হয়নি।
-বাইরের মানুষ কোথায়! মি.ফিরোজই তো!
.
এলির তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে শাম্মি বললো-
সরি।
-আমি এসব বলছি মানে এই না যে তুই যা করেছিস তা অন্যায় নয়।
-হু।
-তুই কি তাকে বলেছিস আমার জন্মদিন আজ?
.
মাথা নেড়ে শাম্মি জবাব দিলো-
তোমার দিব্বি বলিনি।
-ঠিক আছে।
.
এলির পাশে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে শাম্মি বললো-
হ্যাপি বার্থডে মা! আমিতো ভুলেই গিয়েছিলাম আজ তোমার জন্মদিন।
-হয়েছে ছাড় ছাড়। বুড়ি মানুষের আবার কি জন্মদিন!
.
মাথা উঠিয়ে শাম্মি বললো-
তুমি মোটেও বুড়ি নও। তুমি বুড়ি হলে ৮০বছর যাদের তাদের কি বলবে শুনি?
-এতো কথা বাপু জানিনা। নাস্তা দিচ্ছি টেবিলে। খেতে আয় ফ্রেশ হয়ে।
-তুমি যাও, আমি আসছি।
.
.
শাম্মির জানামতে সে ফিরোজকে জানায়নি আজ এলির জন্মদিন। তাহলে মি.ফিরোজ সত্যিই মনে রেখেছেন তার মায়ের জন্মদিনের কথা!
মোবাইলের রিং বেজে উঠলো শাম্মির। সাব্বিরের কল দেখতেই রিসিভ করে বললো-
হুম বলো?
-বাব্বাস! হাই হ্যালো কিছু নাই। শুরুতেই বলো?
-পোষালে কথা বলো না পোষালে ভাগো।
-আমিতো তোমার দরকারেই ফোন দিয়েছি, নাহলে আমার কি! কিচ্ছুনা। রাখছি।
-আরে ওই! হাই হ্যালো, কেমন আছো? সবটা বলে দিয়েছি। এবার বলো কেনো ফোন দিয়েছো?
-শাশুমা উপহার সামগ্রী পেয়েছে?
-কিসের উপহার?
-আরে কাল তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিতেই ফিরোজ আঙ্কেলের ফোন এসেছিলো। তিনি বলেছিলেন আজ আন্টির জন্মদিন।
-তাই তুমি গিফট কিনেছো?
-আমি না। আঙ্কেলকে শিখিয়ে দিয়েছি। উনিতো সেই ভয় পাচ্ছিলেন বাসার সামনে এসব রাখার জন্য। বাধ্য হয়ে কাজটা আমিই করলাম।
-বলো কি! তুমি এখানে এসেছিলে?
-হু। উনিও ছিলেন। তবে দূরে দাঁড়িয়ে। এসব দিয়েই দুজনে সকালের নাস্তা সেরে নিলাম রেস্টুরেন্ট থেকে। তাই এতোক্ষণ ফোন দিইনি তোমাকে। এবার বলো আইডিয়া কেমন হয়েছে?
-ফাটাফাটি! তবে গিফট কি ছিলো?
-আমি কার্ডের আইডিয়া দিয়েছি আর আঙ্কেল একটা লাল শাড়ি নিয়েছিলেন।
-ওহ!
-আচ্ছা আমি রাখছি তবে।
আমার আবার আজ থেকে অফিসে জয়েন করতে হবে।
-শুনো?
-হু?
-বেস্ট অফ লাক।
-থ্যাংক্স।
.
ফোনটা রাখতেই মুখে হাসির ঝলক ফুটলো শাম্মির। তার ২০বছর জীবনে সে কখনো এলিকে লাল শাড়ি পরতে দেখেনি। মি.ফিরোজের বুঝি লাল রঙ পছন্দের?
.
.
.
-আজ সকালের নাস্তা কিরে আপু?
.
শাকিলের কথা শুনে চেয়ার টেনে বসতে বসতে শাম্মি বললো-
আমাকে কোন সময় নাস্তা বানাতে দেখেছিস তুই?
.
শাকিল কিছু বলার আগেই টেবিলের উপর নাস্তার ট্রে রেখে এলি বললো-
ডিমের অমলেট আর আটার রুটি।
.
মায়ের কথা শুনে শাকিলের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। ডিম খেতে তার মোটেও ভালো লাগেনা কিন্তু তার মা রোজ একটা হলেও তাকে ডিম খাইয়ে ছাড়ে। সেটা যে সময়েই হোক।
.
শাকিলের ফ্যাকাশে মুখ দেখে এলি বললো-
ডিমকে বলা হয় সুপারফুড। ডিমে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন এবং মিনারেলস। প্রোটিনের সব চাইতে ভালো উৎস হচ্ছে ডিম। এতে ক্যালোরিও থাকে বেশ কম। সকালের নাস্তায় অবশ্যই প্রত্যেকের ডিম খাওয়া উচিত।
.
মুচকি হেসে শাম্মি বললো-
ডিম আমার ভালো লাগে। কিন্তু রুটি না করে পরোটা করলেই পারো মা।
-আটার রুটি বেশ ভালো এনার্জি সরবরাহ করে আমাদের দেহে যা পুরো দিনই রাখবে সতেজ। তেলে ভাজা পরোটা থেকে দূরে থাকা ভালো।
-প্রতিদিন এসব শুনতে শুনতে মুখস্থ হয়ে গিয়েছে আমার। বলি?
.
শাকিলের কথা শুনে ভ্রু জোড়া কুচকে এলি বললো-
মারবো এক থাপ্পড়। তোদের রুটি, ডিম ছাড়া আর কিছু কি আমি খাওয়াই না?
-সেটা বলিনি। তবে মা পরোটা খেতে ইচ্ছে করছে প্রচুর। সাথে আলু ভাজি। চলবে নাকি প্লিজ?
-উম্ম. . হুম। তবে কাল। আর হ্যাঁ, সামনে তোর এস.এস.সি পরীক্ষা। শরীর ঠিক থাকতে হবে কিন্তু। আজ থেকে রাতে দুধও খেতে হবে।
.
মায়ের কথা শুনে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেসে দিলো শাম্মি।
অসহায় কণ্ঠে শাকিল বলে উঠলো-
এই দুধ আর ডিম কেনো আমার অপছন্দ!
.
.
.
বিকেল ঘনিয়ে সন্ধ্যে এসে গেলো। এই সময়টাতে মনটা এতো খারাপ লাগে কেনো? রাতের মতো তার জীবনটাতেও অন্ধকার নেমে এসেছিলো বলে?
.
ভাবতেই মনের গহীন থেকে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো এলির।
ড্রয়ার খুলে ফিরোজের দেয়া লাল শাড়িটা হাতে নিয়ে দেখতে লাগলো সে। একটাবার কি পরবে সে এই শাড়িটি?
-ওয়াও মা! বেশতো শাড়িটা!
.
শাম্মির কথায় নড়ে উঠলো এলি। হাতে থাকা শাড়িটা বিছানার উপরে রেখে বললো-
কিছু বলবি?
-হু। তুমি এখন এই শাড়িটা পরবা।
-মানে!
-প্লিজ মা?
-এই বয়সে লাল কাতান শাড়ি!
.
মায়ের কাছে এসে শাম্মি বললো-
তাতে কি হয়েছে? তোমাকে কখনো লাল শাড়ি পরতে দেখিনি। প্লিজ মা? পরো?
.
শাম্মির দিকে তাকিয়ে মুখে মৃদু হাসির রেখা টেনে এলি বললো-
ঠিক আছে।
.
এলির কাছে হ্যাঁ জবাব শুনতেই হাতে থাকা মোবাইলের মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করলো শাম্মি-
১৫মিনিট সময় দিচ্ছি। যা করার করে নাও তাড়াতাড়ি।
.
মেসেজটি সাব্বিরের নাম্বারে সেন্ড করে মায়ের উদ্দেশ্যে শাম্মি বললো-
আজ আমি নিজের হাতে আমার মাকে সাজিয়ে দিবো।
.
.
লাল কাতান শাড়িতে নিজের মাকে দেখতে এতোটা ভালো লাগবে জানতোনা শাম্মি।
.
নিজের দিকে অপলক দৃষ্টিতে শাম্মিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে এলি বললো-
কি দেখছিস?
-তোমাকে।
-আগে দেখিসনি।
-এই রূপে দেখিনিতো মেরি মা!
.
হাসতে থাকলো এলি। শাম্মি তার পেছনে এসে চোখের উপর হাত রেখে বললো-
চলো আমার সাথে।
-চোখ কেনো বেধে রেখেছিস?
-আরে সারপ্রাইজ আছে। চলোনা প্লিজ।
.
ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করে এলির চোখ হাত সরাতেই চমকে গেলো এলি।
বেলুন দিয়ে সাজানো পুরো রুমটি। টেবিলের উপর বিশাল একটা কেক। তার চেয়েও অবাক করার বিষয়, সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে ফিরোজ ও সাব্বির।
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)