আমি ভাগ্যবান তুমি ভাগ্যবতী - সাজি আফরোজ


কয়েকটা বাড়ি আছে মানে? আমি কি বাড়ি নিয়ে ছবি তুলবো! জামাই এর সাথে সেলফি তুলে আপলোড করতে না পারলে কি হয়!
.
মেহেরীন এর কথা শুনে তার মা মনোয়ারা খাতুন ভ্রু জোড়া কুচকে বললেন-
সেলফি কেনো তুলতে পারবিনা?
-যে ছেলের ছবি দেখিয়েছো, তার সাথে কি সেলফি তুলে আপলোড দেয়া সম্ভব? সবাই হাহা রিয়েক্ট দিবে তার টাকলা মাথা দেখলে। আর গায়ের রঙ টাও ঠিক নেই।
-ছিঃ মেহেরীন! এসব কি বলছিস? এই শিক্ষা দিয়েছি তোকে আমরা! আর আবীর তো টাকলা না, চুল একটু কম আরকি। তাছাড়া ছেলেদের গায়ের রঙ বেশি ফর্সা হলেও ভালো লাগেনা।
-বডি?
-বডিও হ্যাংলা পাতলা মানায় না। কেমন লেডিস লেডিস লাগে।
.
চেয়ার ছেড়ে উঠে মেহেরীন বললো-
খুব ভালো লেগেছে আবীর কে তোমার?
-হ্যাঁ অনেক।
.
নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে মেহেরীন বললো-
তাহলে আরেকটা মেয়ে জন্ম দিয়ে তার সাথে বিয়ে দিও।
.
.
নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে বসে আছে মেহেরীন।
বাইরে থেকে তার মায়ের চেঁচামেচির শব্দ কানে বাজছে তার।
-সৌন্দর্য্য বড় কথা নয়, ছেলেটা কেমন সেটাই হলো বড় কথা। সুন্দর ছেলে বিয়ে করলি, সে অন্য মেয়েদের সাথে টাংকি মারবে এসব ভালো লাগবে তাইনা?
.
কানে হেডফোন গুজে দিলো মেহেরীন।
ফুল ভলিউমে গান শুনতে লাগলো সে।
বেশি কিছু কি চেয়েছে সে? এমন একজন জীবনসঙ্গী যাকে নিয়ে সবার সামনে সাচ্ছন্দ্যে যাওয়া যাবে, যাকে নিয়ে গর্ব করতে পারবে, সবাই দেখলে বলবে- বাহ মেহেরীন! তোর হাসবেন্ড তো সেই! এসব চাওয়া কি খুব বেশি অপরাধ? কোথাথেকে তার বাবার এক বন্ধু আবীরের জন্য প্রস্তাব নিয়ে আসে। তার মা বাবা সবাই আবীরের সাথে দেখা করলেও সে করেনি। কেননা আবীরের ছবি দেখেই তাকে পছন্দ হয়নি মেহেরীনের। কিন্তু তার মা বাবা আবীরের সম্পর্কে সবটা জেনে তার সাথে দেখা করে। দেখা করার পর আরো বেশি ইন্টারেস্ট দেখায় তার প্রতি। কি আছে ছেলেটার মাঝে? অসুন্দর হয়েও তার মা বাবাকে পটিয়ে ফেলেছে!
.
.
কয়েকদিন কেটে গেলো। কিন্তু মেহেরীনের মায়ের মাথা থেকে আবীরের ভুত নামলো না। তবে মেহেরীন নিজের জায়গায় অটল। কিছুতেই সে আবীরের সাথে দেখা করতে চায়না।
-মেহেরীন?
.
বাবার ডাকে দাঁড়িয়ে পড়লো মেহেরীন।
শাহজাদা খান তার সামনে এসে বললেন-
আবীরের বিষয়ে এতোদিন তোমার সাথে কোনো কথা আমি বলিনি। কিন্তু আর না বলে পারছিনা। মানুষের বাইরের সৌন্দর্য্যই সব না। একবার আলাপ করে দেখতেই পারো ছেলেটার সাথে।
-কিন্তু বাবা...
-আমি তোমাকে বলছিনা তাকে বিয়ে করো, আলাপ করতে কি সমস্যা! আমি নিশ্চয় কিছু বুঝে তোমাকে এ বিষয়ে বলছি।
-জ্বী।
.
শাহজাদা খান চলে যেতেই মায়ের দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকালো মেহেরীন।
মনোয়ারা খাতুন বললেন-
ওভাবে কি দেখছিস?
-তুমিই বাবাকে এসব শিখিয়ে দিয়েছো তাইনা? আমি যে বাবার কথা ফেলতে পারিনা তুমি জানো।
.
মুখ টিপে হাসতে লাগলেন মনোয়ারা খাতুন।
মেহেরীন গম্ভীর গলায় বললো-
আমি দেখা করতে রাজি তবে আমার সাথে বাসার কেউ থাকবেনা। আমি একাই দেখা করবো।
-এমন হয় নাকি! আবীর কি ভাববে?
-ওসব ম্যানেজ করার দায়িত্ব তোমার।
.
.
রেস্টুরেন্টে বসে আছে আবীর ও মেহেরীন। ছবিতে আবীর কে দেখতে যেমনটা লেগেছে বাস্তবেও সে তেমনি। গায়ের রঙ কালো, মাথায় চুল কম বলাই যায়। তবে চেহারাটা বেশ মায়াবী।
মেহেরীন নিজেরমনে ভাবতে লাগলো, তার পাশে আবীরকে কেমন লাগবে?
নাহ, ভালো লাগবেনা। তার পাশে তার মতো সুন্দর কাউকেই মানায়।
মেহেরীন আবীরের উদ্দেশ্যে বললো-
আপনি কি মাইন্ড করেছেন? একা দেখা করতে চেয়েছি বলে?
-বিয়ে আপনি করবেন। সেই হিসেবে আপনি দেখা করতেই পারেন। একা করবেন নাকি সাথে কাউকে নিয়ে এটা নিতান্তই আপনার ব্যাপার। এখানে মাইন্ড করার কিছু নেই।
.
স্মার্ট আন্সার! ছেলে দেখতে ভালো না হলে কি হবে? মনেহচ্ছে বেশ চালাক।
আপনমনে এসব ভেবে মুখে মৃদু হাসি ফুটালো মেহেরীন।
সে হাসিতে চোখ পড়তেই ফিদা হয়ে গেলো আবীর। এতো সুন্দরী এই মেয়েটা কি তাকে বিয়ে করতে রাজি হবে? মোটেও না। বরং এখুনি প্রত্যাখ্যান করবে তাকে। তাই এসব আশা না করাটাই ভালো।
মেহেরীনের দিকে আর মনোযোগ দিলোনা আবীর। ভদ্রতার খাতিরে জিজ্ঞাসা করলো-
বলুন কি খাবেন?
-আপনি যা অর্ডার করেন।
-ওকে আপনি বসুন, আমি একটা জরুরি ফোন সেরে আসছি৷ সাথে অর্ডার টাও করে আসবো।
.
.
হরেকরকমের খাবার অর্ডার করলো আবীর।
কিন্তু মেহেরীন কিছুই খেতে পারলোনা ভালো করে। অপরিচিত কারো সামনে কি খাওয়া যায়!
-কি হলো খান?
.
আবীরের কথা শুনে মেহেরীন বললো-
এতোকিছু অর্ডার করলেন কেনো? শুধু কফি হলেই চলতো।
-আপনি তো সেটা বলেননি।
-বলিনি বলে এতো কিছু!
.
মুচকি হেসে আবীর বললো-
আমাদের চট্রগ্রামের মানুষের হৃদয় অনেক বড়।
.
কিছুক্ষণ পর ওয়েটার আসলে আবীর তার উদ্দেশ্যে বললো-
নাম কি আপনার?
-ফরিদ।
-তা ফরিদ সাহেব, এখানে তো অনেক খাবার রয়ে গিয়েছে, এসব কি করবেন?
-ফেলে দিবো।
-ভালো খাবার গুলো ফেলে দিবেন! খুব খারাপ। এগুলোর টাকা আমি দিচ্ছি। সে হিসেবে খাবার গুলো আমার। সো আমি যা ইচ্ছে করতে পারি?
-আপনি কি প্যাকিং করতে চায়ছেন?
-জ্বী।
-ওকে আমি করে দিচ্ছি।
.
কথাটি শুনে মেহেরীন নিজের মনে হেসে চলেছে।
শুনেছে আবীরের বেশ টাকা পয়সা আছে। সামান্য খাবার যে প্যাকিং করে নিয়ে যায়, তার অন্তর কতো বড় জানা হয়ে গেলো মেহেরীনের।
.
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে এলো তারা। আবীর বললো-
চলুন আপনাকে ড্রপ করে দিই।
-না তার প্রয়োজন নেই, আমি চলে যেতে পারবো।
.
একটা রিকশা ঠিক করে তাতে উঠে গেলো মেহেরীন। আর ফিরেও তাকালোনা আবীরের দিকে। বাসায় গিয়ে সবাইকে বলবে, একে পছন্দ হয়নি তার।
কিছুদূর রিকশা যাওয়ার পর কি মনেকরে চলন্ত রিকশা থেকেই পেছনে তাকালো মেহেরীন।
এক বুড়ো ভিক্ষুকের হাতে রেস্টুরেন্ট থেকে আনা প্যাকেট টা তুলে দিচ্ছে আবীর। এই দৃশ্যটি দেখে চোখ আটকে গেলো মেহেরীনের। এজন্যই তাহলে ওসব প্যাকিং করে নিয়েছিলো আবীর!
.
.
বাসায় আসার পর মনোয়ারা খাতুন উৎসুক দৃষ্টিতে মেহেরীনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন-
আবীরকে কেমন লেগেছে?
-আমি আবীরকে বিয়ে করতে রাজি মা।
.
মেহেরীনের মুখে কথাটি শুনে বিস্ময়ের শেষ পর্যায়ে চলে গেলেন মনোয়ারা খাতুন। আনন্দিত কন্ঠে বললেন-
আলহামদুলিল্লাহ!
.
.
প্রায় ২০দিন পর...
ধুমধাম ভাবে বিয়ে হয়েছে আবীর ও মেহেরীনের। বিয়ের পরের দিনই তারা বের হয়েছে। এসেছে একটি রেস্টুরেন্টে।
আবীর খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করলো-
আচ্ছা মেহেরীন? তুমি আমাকে বিয়ে করতে রাজি হলে কেনো? এখনো কিন্তু জানা হলোনা।
-জানার খুব শখ?
-অনেক। কেননা তুমি আরো ভালো কাউকে ডিসার্ব করো।
-তাই নাকি! ওকে একটু পরেই জানবে।
.
কিছুক্ষণ পর মেহেরীন ওয়েটারের উদ্দেশ্যে বললো, বেঁচে যাওয়া খাবারগুলো প্যাকিং করে দিতে।
আবীর কিছু বললোনা। চুপচাপ দেখতে লাগলো সে কি করে!
রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে, একজন বয়স্ক রিকশা চালকের হাতে প্যাকেট টা তুলে দিলো মেহেরীন। আবীর তার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। মেহেরীন বললো-
সৌন্দর্য্যই মানুষের জীবনে সব নয়৷ মন সুন্দর হলেই সবটা সুন্দর মনেহয়। সেদিন তোমার কার্যকলাপ মুগ্ধ করেছে আমাকে। আমি তো এমন একজনকেই চেয়েছিলাম, যাকে নিয়ে আমি গর্ব করতে পারবো। আর সে তুমি ছাড়া আর কেউ নয়। এবার তো বুঝলে কেনো রাজি হয়েছি বিয়েটাই?
.
আবীর তার পাশে এসে বললো-
আমি আসলেই ভাগ্যবান।
-উহু, আমি ভাগ্যবতী!
.
সমাপ্ত

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)