শেষ থেকে শুরু - সাজি আফরোজ (পর্ব ২)


শাম্মীর ফোন পেয়ে মুখে হাসির রেখা ফুটিয়ে রিসিভ করে সাব্বির বললো-
কি খবর শাম্মু?
-খবর ভালোনা সাব্বির।
-কি হয়েছে?
-আরে মি.ফিরোজ আমার রিকোয়েস্ট এক্সেপ্ট করেননি। কতো কষ্ট করে খুঁজে খুঁজে তার আইডিটা বের করেছি।
-ওহ!
-তাকে কি মেসেজ রিকোয়েস্ট দিবো?
-তোমার খুশি।
-হুম এটাই করি বরং। তারপর না হয় ফোন নাম্বার চেয়ে নেবো।
-আচ্ছা আমি রাখছি।
-ঘুমোবে?
-না।
-তাহলে?
-তুমি যেসব বলতে আমাকে ফোন দিয়েছো ওসব শুনতে আমার মোটেও ভালো লাগছেনা। একবারো জানতে চেয়েছো আমার বাসায় তোমার ব্যাপারে কি বলেছে? আসলে তোমার ইচ্ছাই নাই বলো জানার।
-এমনটা কেনো ভাবছো তুমি সাব্বির!
-কেমনটা ভাববো বলো?
-আচ্ছা আমি সরি। বলো তোমার বাসায় কি বলেছে?
-বাদ দাও।
-আরে বলোনা!
-কিচ্ছু বলেনি এখনো। তাইতো চিন্তায় আছি।
-ওহ! চিন্তা করোনা, যা হবে ভালোই হবে।
.
.
.
-তোমার কানের দুলগুলো এতো কিউট কেনো?
-তোর শেষমেশ আমার কানের দুলের প্রতি নজর গিয়েছে ফ্রিজ!
-তুমি আমাকে আবার ফ্রিজ বলে ডেকেছো!
-ওহ ডাকবো না! ফিরোজ বেশি সুন্দর?
-হুম।
-মোটেও না। আমার কাছেই ফ্রিজই বেশি সুন্দর।
.
ফিরোজের ফ্যাকাসে মুখের দিকে তাকিয়ে এলি বললো-
তুই যতদিন আমাকে তুই করে না বলবি ততদিন আমি তোকে ফ্রিজই ডাকবো। বুঝেছিস?
-আমি পারবো না তোমাকে তুই বলে সম্বন্ধন করতে।
-আপন ভাবিস না তাই। আমি তোকে বেস্ট ফ্রেন্ড ভাবি কিন্তু তুই তো আমাকে পর ভাবিস। এইজন্যই তুই করে ডাকতে পারিস না। অথচ দেখ কলেজে এডমিশন নেওয়ার পর থেকেই কিন্তু আমাদের ফ্রেন্ডশিপ হয়েছে। এখন আমরা সেকেন্ড ইয়ারে কিন্তু তোর কোনো উন্নতি নেই আমাদের ব্যাপারে।
.
কথাটি বলে এলি মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতে চাইলে ফিরোজের ডাকে দাঁড়িয়ে পড়লো।
-কি হয়েছে?
.
আচমকা এলির হাত ধরে টেনে নিজের কাছে এনে চোখে চোখ রেখে ফিরোজ বললো-
কেনো তোমাকে তুই করে বলতে পারিনা জানো? কারণ আমি তো তোমাকে আমার জীবনে বন্ধু হিসেবে চাইনা৷ সহধর্মিণী হিসেবে চাই। আর নিজের বউকে কেউ তুই করে বলে?
.
.
দেওয়ালের ঘড়িটা ডিংডং শব্দ করতেই ঘুম ভেঙ্গে গেলো এলির।
স্বপ্নে আগের দিনে ফিরে গিয়েছিলো সে। সেই দিনটায়, যে দিনে ফিরোজ তাকে প্রথমবারের মতো মনের কথা জানিয়েছিলো।
যা ছিলো তার কাছে একেবারেই অনাকাঙ্ক্ষিত।
ফিরোজের প্রস্তাবে খানিকটা চমকে গেলেও অবাক হয়নি সেদিন এলি। কেননা সে নিজেও জানতো তার আর ফিরোজের সম্পর্কটা বন্ধুর চেয়েও একধাপ এগিয়ে গিয়েছে। এই ধাপটা আরো এগুলে তাদের সম্পর্কটা আরো গভীর হবে। ফিরোজকে নিজের অজান্তেই মনে জায়গা দিয়েছিলো এলি। ফিরোজও তাকে ভালোবাসতো সে জানতো। কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি পাগলটা তার মনের কথা জানাবে তা ভাবতে পারেনি এলি।
.
সেদিনের কথা ভেবে মুখের কোণায় এক চিলতে হাসি ফুটলো এলির। হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে তার সেই সময়টায়।
হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে ফিরোজের মাঝে! কিন্তু এই চাওয়াটা যে অন্যায়, বড্ড অন্যায়। পরক্ষণেই তা মনে হতে মাথাটা হালকা ঝেরে নিলো এলি। বিছানায় শরীর এলিয়ে দিলে বালিশটা হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে চাপা কান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়লো সে। এই এক অদ্ভুত ব্যস্ততা!
.
.
.
বেলা ১২টা বেজেছে। কিন্তু ফিরোজ নিজের রুম থেকেই বের হয়নি এখনো। সে কি এখনো ঘুমোচ্ছে?
এসব ভেবে ভেবে ফিরোজের মা তার রুমের দরজার পাশে গিয়েই ফিরোজকে বিছানার উপরে বসা দেখতে পায়।
তিনি ফিরোজের পাশে বসে একটা ছবি দেখিয়ে বললেন-
এই মেয়েটা কেমন?
-কার ছবি মা এটা?
-তোর জন্য পাত্রি দেখছি। ঘটক দিয়েছেন। এই মেয়েটা চাকরি করে। বাবা মরা মেয়ে। সংসারের হাল সে একাই ধরেছিলো। যার কারণে বিয়ে করা হয়ে উঠেনি। তবে তোর চেয়ে বয়সে আরো ছোট হবে সে।
-ওহ।
-ওহ! ছবিটা দেখ?
.
মায়ের কথা শুনে মুচকি হাসলো ফিরোজ। বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে প্যান্টের পকেটে হাত দুটি ঢুকিয়ে বললো সে-
তোমার পছন্দ হলেই হবে মা। আমার দেখার কিছু নেই।
- আলহামদুলিল্লাহ।
.
'যাকে চেয়েছিলাম তাকে পাইনি মাগো, ২০বছর আগেই তাকে হারিয়েছি আমি। আমার এই মনের মনি কোঠায় আর কাউকে যে বসাবো এটা ভাবিনি কখনো। কিন্তু তোমার মুখপাখে তাকিয়ে কালকের আবদারটি অগ্রাহ্য আমি করতে পারিনি। বাবার কথা বলে ইমোশনাল করে ফেললে যে! তবুও বড্ড ইচ্ছে করছে মা তোমার কোলে মাথা রেখে বলার জন্য, আমি আজো ভালোবাসি সেই এলিকে। অন্য কাউকে বিয়ে করতে হবে এটা ভেবে আমার দমটা আটকে আসছে মা, আটকে আসছে।'
.
বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে মায়ের অগোচরে চোখের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো মুছে নিলো ফিরোজ।
.
.
.
কাজের মেয়ের কথানুযায়ী ড্রয়িং রুমে মায়ের ডাকে এসে তার পাশে সোফার উপরে বসতে বসতে সাব্বির বললো-
আমাকে ডেকেছো মা?
-হু।
-বলো?
-তুই যে মেয়েটির কথা আমাদের বলেছিলি তার ছবি আছে?
-হুম।
-দেখি?
.
মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে গ্যালারি থেকে শাম্মীর একটা ছবি নিয়ে মায়ের দিকে দেখাতেই তিনি বলে উঠলেন-
মাশাল্লাহ!
-তোমার ভালো লেগেছে মা?
-মেয়ে ভালো লেগেছে। কিন্তু শুরুতে প্রেমের বিষয়টা ভালো লাগেনি আমার।
-না চাইতেও শাম্মীর প্রেমে পড়তে বাধ্য হয়েছি আমি। আমার স্টুডেন্ট শাকিলের বোন বলে দীর্ঘদিন ধরে ওকে আমি চিনি। কিন্তু প্রেমে যে পড়ে যাবো বুঝতে পারিনি।
.
সাব্বিরের কথা শুনে তার মা হেসে বলে উঠলেন-
শাম্মী দেখতে যেমন, প্রেমে পড়ারই কথা।
-তার মানে তুমি আমাদের সম্পর্কটা মেনে নিচ্ছো?
-হুম। শাম্মীর মাকে জানাতে বল। বাসায় যাবো তার।
.
কথাটি বলে সাব্বিরের মা নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলেও সাব্বির বসে রয়েছে নিজের জায়গায়।
তার ৩বছরের প্রেমের সম্পর্ক এখন বৈধ সম্পর্কে রূপ ধারণ করবে ভাবতেই বুকের মাঝে শান্তি অনুভব করতে লাগলো সে।
শাম্মীর মা কে তাদের বিষয়ে আগে জানানো হয়েছে। তিনি সাব্বির কে চাকরি জোগাড় করে নিজের বাসায় আগে ব্যাপারটা জানাতে বলেছিলেন।
আজ সে চাকরিও পেয়েছে, পেরেছে বাসায়ও রাজি করাতে। চাকরিতে জয়েন হয়ে গেলেই বিয়েটা সম্পন্ন হতে পারবে তাদের। তারপরেই শাম্মী শুধুই থাকবে সাব্বিরের!
এসব ভেবে আনমনে হাসলো সাব্বির।
হাতে থাকা মোবাইলে মেসেজ অপশনে গিয়ে টাইপ করলো-
আমাদের সেই জায়গায় চলে এসো বিকাল ৪টাই। সারপ্রাইজ আছে আজ।
.
মেসেজটি সেন্ড করে দিলো সে শাম্মীর নাম্বারে। তাদের বিয়ের কথা শুনে শাম্মী কি করতে পারে ভাবতে লাগলো সাব্বির।
.
আজ রাতেই নাকি দেখতে যেতে হবে মিনু নামক মেয়েটিকে ফিরোজের। তার মা এতো তাড়াতাড়ি সব ঠিক করে ফেললেন! ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো বুক চিরে ফিরোজের।
বারবার সে ঘড়িতে সময় দেখতে লাগলো। আজ বুঝি সময়টা খুব দ্রুতই চলে যাচ্ছে!
.
.
'আঙ্কেল আমি শাম্মী। আমার মায়ের নাম এলি। সেই এলি, যে এলির আপনার প্রেমিকা ছিলো একসময়। কিছু কথা ছিলো আপনার সাথে। একটু সময় হবে কি?'
.
সেই কবে এই মেসেজটি ফিরোজের ফেবুতে পাঠিয়েছে শাম্মী। কিন্তু ফিরোজ মেসেজ সিন করছে না। কখন দেখবে সে শাম্মীর মেসেজ!
.
এসব ভেবে ভেবে পার্কের দোলনায় বসে দোল খাচ্ছে শাম্মী। হঠাৎ তার পেছন থেকে কেউ বলে উঠলো-
অনেকক্ষণ হলো বুঝি এসেছো?
.
সাব্বিরের কথা শুনে দাঁড়িয়ে পড়লো শাম্মী। পেছনে ফিরে মুখে হাসির রেখা এঁকে বললো সে-
না, মাত্রই এলাম।
.
শাম্মীর কাছে এসে সাব্বির বললো-
তোমার মাকে তৈরী হতে বলো। আমার বাসায় আমাদের সম্পর্ক মেনে নিয়েছে।
.
সাব্বিরের কথা শুনে মৃদু হেসে শাম্মী বললো-
তাই নাকি!
-হু।
.
পরক্ষনেই নীরব হলে শাম্মী। তাকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সাব্বির বললো-
কি হয়েছে শাম্মী?
-আমার বিয়ের আগে মায়ের বিয়েটা দিতে চাইছিলাম আমি।
.
শাম্মীর কথা শুনে অবাক হলো সাব্বির।
শাম্মীর উপর প্রচন্ড রাগ উঠলেও নিজেকে শান্ত করে বললো সে-
মি.ফিরোজের সাথে কথা হয়েছে?
-না।
-তবে?
-উনি দেখলে নিশ্চয় রিপ্লাই দিবেন।
-তুমি বলতে চাইছো আমাদের বিয়ের আগেই তোমার মায়ের বিয়ে দিবে তুমি?
-হুম।
-এমন টা হলে আমার বাসায় কি সবটা স্বাভাবিক থাকবে শাম্মী?
-কেনো থাকবে না?
-একটা বুড়ি মায়ের বিয়ে তুমি দিবে আর সবাই তালি বাজাবে এটাই ভাবছো তুমি?
-সাব্বির!
-কি সাব্বির! কদিন ধরে আমার মাথাটা খারাপ করে দিচ্ছো তুমি। এমন ভাব করছো যেনো তোমার মেয়ের বিয়ে দিতে চাইছো।
.
ছলছল নয়নে সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে শাম্মী।
কিছুক্ষণ নীরব থাকার পরে সে বললো-
আমার মায়ের বিয়েই আগে হবে। তা জেনে যদি তোমার বাসায় আমাকে মেনে না নেয় তবে আমি বিয়ে করবো না।
.
আর দাঁড়ালো না শাম্মী। হনহন করে হেটে চলে যেতে লাগলো সে।
সাব্বির অসহায় দৃষ্টিতে তার পথের পানে তাকিয়ে রইলো।
মেয়েটির দূর্বল জায়গায় আঘাত করে ফেললো সে।
কিন্তু সাব্বির অন্যায় কিছু বলেনি। এসব শুনে তার বাসায় নিশ্চয় ঝামেলা পাকাবে। এসবের মাঝে পড়ে তবে কি তাদের সম্পর্ক পূর্ণতা পাবেনা!
.
(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

তুমি আছো বলে - নৌশিন আহমেদ রোদেলা (সকল পর্ব ১-১৮)

রঙ চা - মাহফুজা মনিরা (সকল পর্ব ১-২৬)

কলঙ্কের ফুল - সাজি আফরোজ (সকল পর্ব ১-২৯)