হতাশা - সাজি আফরোজ
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তমালিকা। নিজেকে দেখছে সে নিশ্চুপভাবে।
চোখ দুটো ফুলে গিয়েছে। মুখটাও লালচে হয়ে আছে। খুব কেঁদেছে কিনা সে! অথচ এমন কিছু হবে সেটা কি ভেবেছিলো সে? মোটেও না। ভেবেছিলো ভালোবাসার মানুষটার সাথে ভালোই থাকবে সে। তাই তো বাসার কেউ তাদের সম্পর্ক টা মেনে না নিলেও, সোহানের হাত ধরে পালিয়ে এসেছে সে একটু সুখের জন্য। কিন্তু সুখ যেনো ধরাই দিচ্ছেনা তাকে।
পালিয়ে আসাতে সোহানের পরিবারও মেনে নেয়নি তাদের। একমাত্র খালার কাছে সোহানকে নিয়ে আসে তমালিকা, একটা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। ভাড়া বাসায় থাকেন তমালিকার খালা তানিয়া বেগম। নিজেই ভাড়া থাকেন, বোনের মেয়েকে জায়গা দিবেন কি করে! ফেলেও দিতে পারেন না।
তমালিকা তার খুব আদরের কিনা!
তাই একই বাড়ির একটা ফ্লাটে ভাড়া থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন তাদের তানিয়া বেগম।
থাকার জায়গা পেলেই তো সংসার হয়ে যায়না, খরচারও একটা ব্যাপার আছে। নাহলে সংসার চলবে কি করে? তাই
সোহান চাকরীর জন্য চেষ্টা করতে থাকলো। তবে চাকরী পাওয়া কি এতো সহজ? সোহান ব্যর্থ হতে থাকে। এদিকে সোহানের এমন অবস্থা যেনো সহ্য হয়না তমালিকার। বাসার পাশেই একটা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে। সেখানে কাজের জন্য গেলো সে। ভাগ্যক্রমে কাজ পেয়েও গেলো। সে ভেবেছিলো সোহান হয়তো তাকে এই কাজ করতে বাধা দিবে। কিন্তু সে দেয়নি। এতেই যদি সোহান খুশি হয় তবে সেও খুশি। ভালোবাসার জন্য মানুষ কি না করতে পারে!
কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। বড় ঘরের মেয়ে হওয়াতে বাড়ির কোনো কাজই করতোনা তমালিকা। এসব সেলাই কাজ সে কিভাবে করবে! তাই তার এসব কাজ করতে অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। তবে একটাই আশা, একদিন ঠিকই শিখে যাবে। হয়তো পরিস্থিতিই শিখিয়ে ফেলবে।
তমালিকার এই ধারণাটা ভুল হলো। পারলোনা সে পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে। আজ তাকে মারাত্মক ভাবে অপমান করা হয়। তার মুখের উপরে পোশাক ছুড়ে মেরে ফ্লোর ম্যানেজার বলেছেন-
এসব কি সেলাই করো তুমি! কিছু জানোনা তা জেনেও কাজে রাখা হয়েছিলো। এতোদিন যদি শিখতে সময় ফেলে দাও কাজ করবে কখন! কোনো প্রয়োজন নেই তোমার মতো কর্মী।
.
কোনো কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে এসেছে তমালিকা। এমনভাবে অপদস্ত আগে সে কখনো হয়নি। ভীষণ খারাপ লাগছে তার। ইচ্ছে করছে সোহানের বুকে মাথাটা রেখে কিছুক্ষণ ফুপিয়ে কাঁদতে।
কিন্তু কোথায় সে?
.
বাইরে থেকে ঘেমেভিজে একাকার হয়ে বাসায় মাত্রই প্রবেশ করলো সোহান।
তাকে দেখে তার পাশে এসে তমালিকা বললো-
কোথায় গিয়েছিলে?
.
একরাশ হতাশা নিয়ে সোহান বললো-
আরেকটা ইন্টারভিউ দিয়ে আসলাম। আর কতোটা দিতে হবে জানিনা।
-ধৈর্য্য রাখো।
-ক্ষিদে পেয়েছে। খেতে দাও।
.
কথাটি বলে সোহান ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গেলো।
দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে তমালিকা বিড়বিড়িয়ে বললো-
আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আজ তুমি কিছুই বুঝলেনা সোহান! অদ্ভুত না?
.
সোহান ভাত খেতে খেতে তমালিকার উদ্দেশ্যে বললো-
তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও তমা। এভাবে ধীরে খাচ্ছো কেনো! লাঞ্চ টাইম শেষ হবার আগেই তো কাজে যেতে হবে তোমাকে।
-আমি আর যাবোনা।
-যাবেনা মানে?
-আমি ওসব পারছিনা সোহান। তাই...
.
তমালিকার পুরো কথা না শুনেই নিজের ভাতের প্লেটে পানি ঢেলে সোহান বললো-
এসব কি রেঁধেছো! কি পারো টা কি তুমি? আল্লাহ কি বুঝে তোমাকে মেয়ে বানিয়েছেন তিনিই জানেন।
-এতোদিন তো কিছু বলোনি তুমি! ঠিকই খাচ্ছিলে, তবে আজ কি হলো?
-এতোদিন কুখাদ্য খেয়েছি। মুখ ফুটে বলিনি। তাই বলে প্রতিদিন এসব কুখাদ্য খেতে পারবোনা। যত্তসব...
.
সোহানের কথার কোনো জবাব না দিয়ে ফ্লাট থেকে বেরিয়ে পড়লো তমালিকা। উদ্দেশ্যে খালার ফ্লাটে যাওয়া।
.
খালার পাশে বসে তমালিকা রাগে ফোঁসাতে ফোঁসাতে বললো-
আমি নাকি কুখাদ্য রান্না করি খালা। তাই যদি হয় এতোদিন বলেনি কেনো! আমি ভালোভাবে তোমার কাছ থেকে শিখে যেতাম। এভাবে পানি ঢেলে দেয়ার কোনো মানে হয়!
-এসব আমাকে বলছিস কেনো! পালানোর সময় মনে ছিলোনা এসব? তোকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছি বলে তোর মা আমার সাথে ভালোভাবে কথাই বলেনা। তোর খালুও এই ব্যাপারে রেগে আছেন আমার উপর। তার উপর আমাকে এসব শোনাতে আসিস কোন আক্কেলে? জেনে শুনেই তো ওই ছেলেরে বিয়ে করেছিস। আমি কি করতে পারি!
-তোমাকে একটু দুঃখও বোঝাতে পারবোনা খালা?
-ভালো লাগছেনা এসব শুনতে আমার। কতো সুন্দরী মেয়ে তুই! কতো ভালো ভালো প্রস্তাব আসতো। আর তুই কিনা
মা বাবার মুখ পুড়িয়ে পালিয়েছিস।
তবুও তোর মা বাবা বলেছেন, তুই ভুল বুঝে তাদের কাছে ফিরে গেলে মেনে নিবে তোকে। তো চলে যা ওই সোহানকে ছেড়ে, ভালো না লাগলে। আমাকে আর এসব শোনাতে আসিস না।
.
খালার কথা শুনে যেনো চারদিকে অন্ধকারে ঘিরে আছে মনে হতে লাগলো তমালিকার কাছে। সত্যিই তো! তাকে কেনো এভাবে জ্বালাতন করছে সে!
.
নিজের ফ্লাটে ফিরে এলো তমালিকা। ফ্লাট শূন্য দেখে বুঝতে পারলো সোহান নেই। দরজাটা বন্ধ করে সে নিজের রুমে এসে শুয়ে পড়লো। কিছুসময় একা থাকতে চায় সে।
.
গোসল সারার পর ধোয়া কাপড় গুলো শুকোতে দেয়া হয়নি। এসব শুকোতে দেয়ার জন্যই ছাদে এসেছিলো সোহান।
ফ্লাটের সামনে এসে কিছুক্ষণ দরজায় কড়া নাড়লো সে। ভেতর থেকে কোনো শব্দ পেলোনা সোহান।
বুঝতে পারলো অভিমান করেছে তমালিকা। তাই বলে দরজা বন্ধ করে রাখবে! সে তানিয়া বেগমকে ডেকে নিয়ে আসলো। তিনিও অনেক ডাকাডাকি করলেন, কিন্তু কোনো জবাবই দিলোনা তমালিকা। এবার কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন তারা। তানিয়া বেগম বললেন-
মেয়েটা রাগের বশে খারাপ কিছু করে বসছে নাতো? বাড়িওয়ালার কাছে এক্সট্রা দরজার চাবি আছে কিনা দেখো।
.
বাড়িওয়ালার কাছে আর কোনো চাবি নেই শুনে, তাকে সোহান অনুরোধ করলো দরজাটি ভাঙার জন্য।
বাড়িওয়ালা কথাটি শুনে তাচ্ছিল্যের একটা হাসি দিয়ে বললেন-
কোন জনমের আত্নীয় হও তোমরা আমার? তোমাদের জন্য আমার সেগুন গাছের দরজা ভাঙবো আমি?
-তমা আপনার মেয়ের মতো আঙ্কেল। প্লিজ...
-ওর মতো বদমাশ মেয়ে আমার মেয়ের মতো হতে পারেনা। তার উপর গামেন্টস কর্মী! তোমার সাহস কি করে হয় ওকে আমার মেয়ের মতো বলার?
.
ভেতর থেকে চেয়ার টানার শব্দ শুনতে পেলো তারা।
বাড়িওয়ালা হেসে বললেন-
শব্দ যখন আসছেই তাহলে ঠিকই আছে সে। এসব মেয়েরে ভালোভাবে চিনি আমি। কিছুই করবেনা, তোমাকে নিজের বশে রাখার জন্য এসব নাটক করছে।
.
এপর্যায়ে বাড়িওয়ালার সাথে তর্কে লিপ্ত হয়ে পড়লো সোহান ও তানিয়া বেগম।
এভাবে বেশকিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর ভেতর থেকে কোনো শব্দ না পাওয়ায় দরজা ভাঙতে বাধ্য হয় সোহান। কিন্তু ভেতরে ঢুকে যা দেখলো তাতে সবাই যেনো থমকে গেলো। সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছে তমালিকার নিথর দেহটি। ততক্ষণে আশেপাশে সবাই ভিড় জমিয়ে ফেললো। তমালিকাকে এই অবস্থায় দেখে তার একজন সহকর্মী বলে উঠলো-
মেয়েটাকে আজকে কাজেও অনেক অপমান করা হইছে। আমার শরীর খারাপ লাগছে বলে যাইনাই আর। ইশ আমিতো এসে পারতাম ওরে একটু শান্তনা দিতে!
.
কথাটি শুনেই একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো সোহান ও তানিয়া বেগম।
তাদের দুজনেরই এই বিষয়ে জানা ছিলোনা। জানলে হয়তো তার সাথে এমন খারাপ ব্যবহারটা করতো না!
সোহান নিজের জায়গায় দাড়াতে পারলোনা আর স্থীর হয়ে। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে।
.
একটু পরেই তমালিকার মা বাবাও আসেন। মেয়ের লাশ চোখের সামনে দেখেও তারা যেনো বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না, তাদের মেয়ে আর বেঁচে নেই! কতোবার যোগাযোগ করতে চেয়েছিলো তাদের সাথে সে, কিন্তু তারা তার সাথে কথা বলতেও নারাজ ছিলেন। আজ কি হলো এসবের ফল?
তানিয়া বেগম মুখে কাপড় চেপে কেঁদে চলেছেন। কেনো সে তখন শান্তনা দিয়ে মেয়েটিকে নিজের বুকে আগলে নিলেন না? নিলে বুঝি এমনটা হতোনা!
এই ঘটনার পর থেকেই নিজের প্রতি ঘেন্না হচ্ছে বাড়িওয়ালার। একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে একটা মেয়ের নামে এসব কি বলে ফেললেন তিনি!
জ্ঞান ফেরার পর থেকে পাগলের মতো আচরণ করছে সোহান। চাকরীতে যাবেনা শুনে, রাগের বসে কয়েকটা কথা সে বলেছে তার তমাকে৷ সে কি করে বুঝলোনা তার তমা হতাশায় ভুগছিলো?
..............
হতাশা..
খুবই পরিচিত একটি শব্দ। জীবনের বাঁকে বাঁকে এই হতাশার কারণে থেমে যায় জীবন।
অনেকেই জীবনে বিভিন্ন কারণে নিজের প্রতি আস্থা হারিয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। কি করবে, কার কাছে যাবে, কাকে বলবে কিছুই বুঝতে পারে না। এটা সবার ক্ষেত্রেই হতে পারে।
হতাশাকে আমরা মানসিক বা আবেগীয় সমস্যা বলতে পারি।
হতাশা একটি বড় সমস্যা এবং আত্নহত্যা একটি অন্যতম কারণ। যেটা আমরা উপরোক্ত গল্পেই দেখতে পেয়েছি। যদিও এটি কোনো গল্প নয়। কিছুদিন আগে আমার পাশের বিল্ডিং এ ঘটে যাওয়া একটা সত্যি কাহিনী।
লোক মুখেই সবটা জানা হয়েছে। যেদিন মেয়েটি আত্নহত্যা করে, তার লাশ যে দেখছিলো সবার মুখে একটা কথাই ছিলো-
এতো সুন্দরী একটা মেয়ের জীবন এভাবে শেষ হয়ে গেলো!
আসলে যার সাথে সব ঘটে সে ছাড়া তার অবস্থাটা বোঝার ক্ষমতা কারো থাকেনা। তবুও কি আমরা পারিনা? হতাশাগ্রস্ত মানুষটাকে একটু সময় দিতে? তার সব কথা শুনে তাকে শান্তনা দিতে?
যাতে করে আর কোনো তমালিকা কে যেনো আমরা না হারায়...
আরেকটি কথা আত্নহত্যা শেষ সমাধান নয়।
যখন নিজের হতাশাকে অন্যের হতাশা এবং কষ্টের সাথে তুলনা করবে, তখন দেখবে একজন তোমার চেয়েও অনেক বেশি হতাশা নিয়ে লড়াই করেছে, জীবনকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে সামনের দিকে। তখন নিজের হতাশা এমনিতেই বিলীন হয়ে যাবে।

Comments
Post a Comment