হৃদয়ের গহীনে - সাজি আফরোজ (পর্ব ৫)
এস.এস.সি. পরীক্ষার রেজাল্ট পাবলিস হওয়ার পরে জহুর ঢাকা কলেজে চান্স পায়।
আর হিয়া বান্দরবনের কলেজেই ভর্তি হয়।
হিয়া জহুরের সাথে বাবার ফোন থেকেই কথা বলতো সুযোগ পেলেই।
জহুর প্রতিমাসে একবার করে হিয়ার সাথে দেখা করতে আসতো।হিয়ার কলেজে গিয়ে দেখা করেও মন ভরতোনা তার।ঢাকা যাওয়ার সময় হিয়ার বাসার সামনে গিয়ে দাড়াতো।হিয়া দাড়াতো বারান্দায়।একনজর হিয়াকে দেখে চলে যেতো সে।
এভাবে ৫মাস যাওয়ার পর জহুর হিয়াকে মোবাইল গিফট করে।সেই মোবাইল দিয়েই সে জহুরের সাথে লুকিয়ে রাত জেগে কথা বলতো।
ভালোই চলছিলো তাদের সময়।হঠাৎ একদিন হিয়ার মা হিয়াকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য তার রুমে আসে।
সারারাত ফোনে কথা বলে বেহুশের মতো ঘুমোচ্ছিলো হিয়া।ফোনটাও লুকোতে ভূলে গিয়েছিলো।যার কারণে হিয়ার মাথার পাশেই মোবাইলটি থেকে যায়।
হিয়ার মা হিয়াকে ডাকতে এসেই মোবাইল দেখতে পায়।তার আর বুঝতে বাকি রইলোনা হিয়া কি করছে।
-এই হিয়া উঠ।
-আরেকটু ঘুমাইনা আম্মু।
-এইটা কি?
(চমকে যায় হিয়া,তাড়াতাড়ি উঠে যায়।)
-আম্মু আসলে...
-কি করে ছেলেটি?
-আমার ক্লাসমেট।
-কি!আর কোনো ছেলে পাসনি তুই??
-আম্মু ও খুব ভালো ছেলে।
-দেখ হিয়া বাবার কানে যায় মতো কিছু করবিনা।আজ থেকেই সব শেষ কর।
মা আর ফোনটি ফেরৎ দেয়নি।পুকুরে ফেলে দেয় ফোনটি।
জহুর হিয়াকে আবার নতুন ফোন দেয়।
সেই ফোনটিও মায়ের কাছ থেকে লুকোতে পারেনি সে।আর সেদিনই মা হিয়ার বাবাকে সবটা জানিয়ে দেয়।হিয়ার বাবা কিছু না বলে মোবাইলটি ইট দিয়ে ভেঙেছিলো সেদিন।
মেয়েদের পড়ালেখায় বাধা দিতোনা হিয়াদের পরিবারে।তাই তাদের মেয়ে প্রেম করছে জানতে পারলেও স্কুল বন্ধ হয়নি হিয়ার।কিন্তু তারা খেয়াল রাখতো হিয়া যেনো জহুর থেকে দূরে থাকে।
হিয়াও হার মানেনি।যতবার ফোন ভাঙতো হিয়ার বাবা জহুর আবার দিতো হিয়াকে।
একসময় হিয়াও ফোন সাবধানে রাখতে শিখে যায়।লুকিয়ে দেখা করা,কথা বলা তার অভ্যাস হয়ে যায়।
রোজার সময় কলেজ বন্ধ থাকার কারণে জহুর বান্দরবন থাকতো।সেহেরীর পর সে বাইক নিয়ে চলে আসতো হিয়াকে এক নজর দেখার জন্য।হিয়া বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখতো জহুরকে।
এভাবে লুকিয়ে তাদের প্রেম চলতে থাকে।
দেখতে দেখতে তাদের এইস,এস,সি শেষ হলে হিয়াকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় চট্রগ্রাম শহরে উচ্চশিক্ষার জন্য।হিয়াকে রাখা হয় দিয়াদের বাসায়।
তবে এখন প্রেম করতে সুবিধায় হল হিয়ার।
ক্লাস এর নাম করে দিয়াদের বাসা থেকে বের হয় সে দেখা করে জহুরের সাথে।তবে জহুর ঢাকা ছেড়ে বান্দরবন চলে
আসে।বান্দরবান শহরের একটি কলেজে ভর্তি হয় সে।আর সেখান থেকেই
মাসে ২বার হিয়ার সাথে দেখা করতে আসে।
চায়লেই সেও শহরে এসে হিয়ার সাথে পড়াশুনো করতে পারতো কিন্তু এতে তাদের ক্ষতি হবে।হিয়ার বাবা যদি জহুরের কথা জেনে হিয়াকে বান্দরবন নিয়ে যায় তাহলে আবার আগের মতো কথা বলাটাও কষ্ট হবে।
এভাবে তারা আগে কখনো সময় কাটাতে পারেনি।সবসময় আতঙ্ক নিয়ে কথা বলেছে, দেখা করেছে।
আর এখন অনেক ভালো কেটেছে তাদের সময়টা।
হাসি,কান্না,রাগ-অভিমান সব ছিলো তাদের সম্পর্কে।একটা প্রেমের সম্পর্ক এতো বছর টিকিয়ে রাখাটা আসলেই কঠিন বিষয়।
সেটা আরো কঠিন হয় যখন পরিবার থেকে বিয়ের জন্য চাপ দেয়।
সমবয়সী ছেলের হাতে মেয়ে দিতে তারা নারাজ ছিলো।
সেই সময়টা ছিলো অনেক কষ্টের।একটার পর একটা বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে মা-বাবাকে কষ্ট দিতে হতো।
কিন্তু হিয়া ছিলো নিরুপায়।জহুরকে ছাড়া তার চলতে হবে ভাবতে পারতোনা।
তাই সে ছেলে ভালোনা,সুন্দর না এসব বলেই প্রতিবার বিয়েতে রাজী হতোনা।
কিন্তু মাঝখানে হলো এক বিপত্তি।দিয়ার বাবা এমন একটা প্রস্তাব আনে যেটাই মানা করার কোন রাস্তা ছিলোনা।ছেলে সুন্দর,শিক্ষিত,ভালো জব করে।প্রায় সব ঠিক হয়ে যায়।আর তখনি হিয়া ছেলেটিকে জহুরের কথা বলে বিয়ে ভেঙে দেয়।
ছেলেটি হিয়ার বাবাকে হিয়া যা যা বলেছিলো সবটা জানায়।
সেদিনই হিয়া প্রথম তার বাবাকে কাঁদতে দেখে।
ভেবেছিলো বাবা কষ্ট পাবে এমন কাজ আর সে করবেনা।
কিন্তু সেদিনই তার মা তাকে অবাক করে দিয়ে বলেছিলো-
অনেক তো চেষ্টা করেছি।এতো বছর ধরেই চেষ্টা করলাম,তোর মন থেকেতো জহুরকে সরানো যাচ্ছেনা।উল্টো মান-সম্মান নষ্ট করছিস।তোর বাবা ৬মাস সময় দিয়েছে।এর মাঝে ও যদি ভালো চাকরী পায় তাহলে তোদের সম্পর্ক মেনে নিবে।
আর সেদিন থেকেই ফোন দিলে,দেখা হলেই জহুর হিয়া চাকরী চাকরী করতে থাকে।
এইতো কয়েকমাস আগেও যখন জহুরের সাথে হিয়ার দেখা হয় তখনও সে চাকরীর কথা বলেই যাচ্ছিলো।হঠাৎ তাদের পাশেই একটি মরদেহ পরিবহন গাড়ি মরদেহ নিয়ে যাচ্ছিলো।তা দেখে জহুর বলে উঠে-
আচ্ছা হিয়া আমি মরে গেলে তুইতো আমাকে দেখতেও যাবিনা তাইনা।
-ইশ চাকরীর কথা বলছি বলে এখন মরার কথা তুলছিস তুই!
-যাবিনা তাইনা?
-মাথা গরম করিস না জহুর।
-আরে আমিতো জানতে চাইছি মাত্র।
-আমি গেলে কি আমাকে দেখতে দিবে?
-আমার বাসার সবাই জানে বুঝছিস আমার বউ আছে।আর বউকে দেখতে দিবেনাতো কাকে দিবে!আসিস তুই।
-মার খাবি এখন আরেকটা ফালতু কথা বললে।
ভাবতে ভাবতে চোখ বেয়ে পানি পড়ে হিয়ার।
না তাকে যেতেই হবে।জহুর নিশ্চয় তার পথ চেয়ে থাকবে।না গেলে যে বড্ড অভিমান করবে সে।
কিন্তু কিভাবে যাবে সে!
কান্না চেপে রাখতে পারলোনা হিয়া।কান্নার শব্দে দিয়া আর পিয়ালী উঠে যায়।
.
এই ভোরে হিয়াকে বাসা থেকে বের করা ছিলো একটা কঠিন কাজ।বাসার কেউ জেনে গেলে কিছুতেই বের হতে দিবেনা।নিচে দাড়োয়ান চাচাও কি এখন বের হতে দিবে!যদি বলে দেয় বাসায়!
পা টিপে টিপে পিয়ালী হিয়াদের নিয়ে বের হয়।নিচে যেতেই দেখে মেইন গেইট খোলা।তার মানে দাড়োয়ান চাচা খুলে দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে।তাই তারা দেরী না করেই বের হয়ে যায়।কিন্তু জারিফ এসে পৌছায়নি এখনো।সকাল সকাল গাড়ি না পাওয়ার কারণে অনেকটা পথ হেটে আসতে হয়েছে তাকে।
৩০মিনিট পরে একটা বাস থামে পিয়ালীদের বাসার সামনে।
জারিফ সিট না পাওয়ার কারণে দাঁড়িয়ে ছিলো।এতো সকালেও এতো মানুষের ভিড় থাকে জানা ছিলোনা দিয়ার।তবে সে জানে জারিফ এর বাসে দাড়ানোর অভ্যাস নেই।
সময় ছিলোনা তাই কিছু বলতেও পারেনি।
হিয়াকে বাস এ উঠিয়ে দেয় তারা।মহিলা সিটে জায়গা পায় সে।
হিয়াকে উঠিয়ে দিয়ে পিয়ালী আর দিয়া বাসায় চলে আসে।দুজনের মনেই ভয়।বাসার সবাই হিয়া কোথায় জানতে চায়লে কি বলবে তারা!
ঘুম হলোনা আর তাদের।
টিকেট কেটে বান্দরবনের উদ্দেশ্য রওনা হয় হিয়া আর জারিফ।আজ হিয়ার কোনো ভয় হচ্ছেনা জহুরের কাছে যেতে।শত বাঁধাও যেন সে উপেক্ষা করে তার কাছে যেতে প্রস্তুত।
৩বছর আগে যখন জহুর বাইক এক্সিডেন্ট করেছিলো তার পায়ে প্রচুর আঘাত পায়, ডাক্তার বলেছিলো তার একটি পা আর আগের মতো ভালো হবেনা।জহুরের হাটুর জয়েন্ট ভেঙ্গে গিয়েছিলো।যার কারণে রড লাগিয়ে জয়েন্ট দিতে হয়েছিলো।হিয়াকে ফোন করে অনেক কেঁদেছিলো সে।কিন্তু সেদিন হিয়া যেতে পারেনি পরিস্থিতির জন্য।সেদিন থেকে জহুর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিলো সবার থেকে।শুধু পারেনি হিয়ার থেকে দূরে থাকতে।একদিন জহুর বলেছিলো-
আমার জন্য তোমার কথা শুনতে হবে হিয়া।সবাই বলবে তোমার জামাইয়ের পা ভাঙ্গা।
-তুমি হাটতে না পারলেও আমার সমস্যা নেই।আমার পাশে থাকলে হবে শুধু।
আস্তে আস্তে জহুর আগের মতো হাটতে পারলেও মনে মনে ছোট হয়ে থাকতো সে।
৩বছর পর জহুরের পায়ের অপারেশন করে রড বের করা হয়।জহুরের পা ঠিক হলেও মাঝেমাঝেই ব্যাথা করতো।
চাকরী পাওয়ার পর
আবার বাইক নেয় জহুর।হিয়াকে বলেছিলো সাবধানে থাকবে সে এখন থেকে।
জহুরের সাথে হিয়ার শেষ দেখা হয় ২মাস আগে।যখন সে দিয়াদের বাসা থেকে বান্দরবন গিয়েছিলো নিজ বাসার উদ্দেশ্য।
বান্দরবন বাস স্টেশনে জহুর তার নতুন বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছিলো হিয়ার জন্য।সেদিন হিয়া বাইক এ বসে নিজের ব্যাগ-টা জহুর আর নিজের মাঝখানে রেখেছিলো।
এটা নিয়ে সে কি রাগ জহুর!
সে নাকি এমন গফ প্রথম দেখছে যে নিজেদের মাঝে ব্যাগ রেখে দুরত্ব সৃষ্টি করছে।
তার কথা শুনে অনেক হেসেছিলো হিয়া।সেদিন জহুর হিয়া এক সাথে অনেকক্ষণ সময় কাটিয়েছিলো।জহুর হিয়াকে তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বলেছিলো।
কিন্তু হিয়া বুঝতে পারেনি সেদিনই তাদের শেষ দেখা,আর এসব স্বপ্ন কোনোদিন সত্যি হবেনা
হঠাৎ জারিফ এর ফোন বেজে উঠে।
অচেনা নাম্বার থেকে ফোন।
.
(চলবে)

Comments
Post a Comment